একটি আদর্শ শহরের মোট আয়তনের অন্তত ২০ শতাংশ সবুজ স্থান থাকতে হয়। এ সবুজ শহরের ব্যস্ত নাগরিকদের স্বাস্থ্য ও মানসিক প্রশান্তি রক্ষায় যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকে। রাজধানী ঢাকায় সেই সুবজ রয়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশেরও কম স্থানে। আবার যেটুকু রয়েছে সেখানেও নেই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, যথাযথ তদারকি। অবশ্য দেশের বর্তমান নীতিকাঠামোয় স্পষ্টভাবে ‘সবুজ পরিসর’-কে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। ঢাকার সর্বশেষ বিশদ নগর পরিকল্পনায়ও (ড্যাপ ২০২২-৩৫) কতটুকু সবুজ আচ্ছাদিত অঞ্চল থাকবে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। রাজধানীতে পার্কসহ বিভিন্ন সবুজ পরিসর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ছয় সংস্থা। কিন্তু এ সংস্থাগুলোর মধ্যে পার্ক ও সবুজ পরিসর নিয়ে ধারণা না থাকাসহ নানা সংকটে এসব পার্ক ও সবুজ পরিসর থেকে নগরবাসীর যেসব সুবিধা পাওয়ার কথা তার কোনোটিই মিলছে না।
আইন অনুসারে ঢাকায় পার্কসহ অন্যান্য সবুজ পরিসর তদারকির মূল দায়িত্ব থাকার কথা ছিল দুই সিটি করপোরেশনের হাতে। তবে এ দুটি ছাড়াও আরো যে সংস্থাগুলো তদারকির দায়িত্বে রয়েছে সেগুলো হলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), গণপূর্ত অধিদপ্তর, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ও বন অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজউকের আয়ত্তে থাকা বিভিন্ন পার্ক ও সবুজ পরিসর দেখভালের জন্য দুই সিটি করপোরেশনে হস্তান্তর করার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটি হয়নি। আবার সিটি করপোরেশনের কাছে যেগুলোর দায়িত্ব রয়েছে, সেগুলোয় সবুজায়নের বদলে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করে নিজেদের আয় বাড়ানোর দিকে তারা বেশি মনোযোগী।
ঢাকার সবুজ পরিসর নিয়ে এসব সংকটের কথা উঠে এসেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের এক গবেষণায়ও। গবেষণার পলিসি ব্রিফে বলা হয়েছে, ভূমির ব্যবহারের নিরিখে ঢাকায় সবুজ স্থানের পরিমাণ অন্যান্য ভূমি ব্যবহারের তুলনায় অসম। একটি আদর্শ শহরের জন্য কমপক্ষে ২০ শতাংশ সবুজ স্থান প্রয়োজন হলেও ঢাকায় রয়েছে ৮ শতাংশের মতো। শহরের সবুজ পরিবেশ, বিশেষ করে পার্ক বা বৃক্ষ আচ্ছাদিত বাগান নগরের অধিবাসীদের স্বাস্থ্য, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিভিন্ন সুবিধা দেয়, রাজধানী ঢাকায় যা অনুপস্থিত। ঢাকার সবুজ স্থান কমার পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে।
ঢাকা শহরের সবুজ স্থান পরিচালনায় মূল স্টেকহোল্ডার এবং তাদের জড়িত থাকার পরিমাণ চিহ্নিত করতে ২০২২ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত একটি সমীক্ষা করা হয়। সমীক্ষার প্রয়োজনে সবুজ স্থান রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন নীতিকাঠামো পর্যালোচনাও করা হয়। বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, কেস স্টাডি ও অন্যান্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে পলিসি ব্রিফটি তৈরি করা হয়। সেখানে বলা হয়, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষাবিদ, অ্যাক্টিভিস্ট, বেসরকারি স্টেকহোল্ডারসহ ২০ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গবেষণক দলের সদস্যরা। সমীক্ষায় ছয়টি পার্ক ও সবুজ পরিসরের কেস স্টাডি ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো হলো রমনা পার্ক, হাতিরঝিল, ডিএনসিসি এলাকায় উত্তরা কল্যাণ সমিতি পার্ক ও তাজমহল রোড পার্ক, ডিএসসিসি এলাকায় তেঁতুলতলা খেলার মাঠ ও শহীদ আব্দুল আলিম খেলার মাঠ।
সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তাদের প্রশাসনিক সীমানার মধ্যে সবুজ পরিসর দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছে। এছাড়া রাজউকের অধিক্ষেত্রের মধ্যে সবুজ স্থান, বাংলাদেশ বন বিভাগের অধীন বোটানিক্যাল গার্ডেন ও বলধা গার্ডেন, গণপূর্ত বিভাগের আওতাধীন রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান, ফার্মগেটের আনোয়ার পার্ক (সম্প্রতি মেট্রোরেল ল্যান্ডিং স্টেশনের জন্য ডিএমটিসিএলের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে), জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আওতায় থাকা মিরপুর, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর (পুরনো অংশ) ও বাড্ডা এলাকার আবাসন প্রকল্পে সবুজ স্থানগুলো দেখভাল করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
গবেষণার প্রয়োজনে যাদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর মধ্যে জটিল ব্যবস্থাপনা নেটওয়ার্কের কথা। এমনকি কখনো কখনো সরকারি সংস্থাগুলোও একে অন্যটির প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘সবুজ স্থান রক্ষা করার জন্য আমাদের দেশে একটি সরকারি সংস্থাকে অন্য সংস্থার বিরুদ্ধে মামলা করতে হচ্ছে। এটার কারণ কী?’ আরেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘রাজউক দেখভাল করছে এবং সিটি করপোরেশনকে বুঝিয়ে দিচ্ছে না এমন পার্কগুলোর দীর্ঘ তালিকা আমিই দিতে পারি।’ অর্থাৎ নিয়ম অনুযায়ী এসব সিটি করপোরেশনকে বুঝিয়ে দেয়ার কথা থাকলেও রাজউক তা করছে না। এসব নিয়ে রাজউক ও সিটি করপোরেশনের সম্পর্কও দিনে দিনে জটিল হয়ে উঠছে।
১৯৫৩ সালের নগর উন্নয়ন বিধি অনুযায়ী, শহরের খোলা জায়গা দেখভালের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। কিন্তু অনেক সরকারি সংস্থাই সিটি করপোরেশনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। অবশ্য সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে থাকা পার্ক ও সবুজ পরিসর ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। গবেষক দলকে একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘সিটি করপোরেশন রাজস্ব আয়ের জন্য খোলা জায়গায় মার্কেট বা দোকান তৈরি করে। অনেক সময় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এ অর্থ সরকারের তহবিলে যায় না।’ একই প্রসঙ্গে একজন শিক্ষাবিদ বলেছেন, ‘সবুজ বা উন্মুক্ত স্থান সংস্কার প্রকল্পগুলোর নকশার মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য তৈরি করেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ আগের মতো পার্কগুলো ব্যবহার করে না। ক্যাফে, কফি শপ ও খেলার সরঞ্জামের মতো সুবিধাসহ পার্কগুলোর নকশা ও ব্যবহূত উপকরণ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশকে বর্জন করেছে।’
গবেষণক দলের সদস্য ও বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আফসানা হক ও অধ্যাপক আসিফ-উজ-জামান বলেন, ‘নগরের সবুজ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট ছয়টি সংস্থাসহ স্থানীয় জনগণ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে সমন্বিত কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। সবুজ পরিসরের বাণিজ্যিকীকরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিষয়টির ওপর অবশ্যই নজরদারি জোরদার করতে হবে।’
সবুজ পরিসরসংক্রান্ত এ সংকট নিয়ে কথা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খানের সঙ্গে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সবুজ পরিসর, পার্ক বা খেলার মাঠ নিয়ে আলাদা করে ভাবনার ঘাটতি রয়েছে প্রায় সব সংস্থারই। সবুজকে রক্ষা করতে হবে বা সবুজ আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, বিষয়টি নিয়ে কেউই ভাবছে না। আবার উন্নয়নের নামে পার্কগুলো কংক্রিটের স্থাপনা দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। সবুজকে সবুজের মতো রেখে দেয়া উচিত, এ বোঝাপড়ায় ঘাটতি রয়েছে আমাদের মাঝে। আমাদের পার্ক, খেলার মাঠ বা খোলা জায়গার জন্য নির্ধারিত কোনো নীতিমালা নেই। উন্নত দেশে এসব নীতিমালা থাকে, অনেক দেশে আলাদা কর্তৃপক্ষও রয়েছে। ফলে তারা পার্ক বা খোলা জায়গা সঠিকভাবে দেখভাল বা পরিচর্যা করতে পারে। পার্ক বা গণপরিসরের ওপর সাধারণ জনগণের অধিকার রয়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেসব অধিকার সঠিকভাবে চর্চা করা হয় না।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ২০২১ সালের এক সমীক্ষায় বলা হয়, রাজধানী ঢাকায় যেসব পার্ক বা উদ্যান রয়েছে সেখানে কংক্রিটের আচ্ছাদনের পরিমাণ বাড়ছে। ৬৮ একর আয়তনের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাবিত নকশায় অবকাঠামো, কংক্রিট ও ধূসর এলাকার পরিমাণ শতকরা ৩৭ ভাগ। গুলশানে অবস্থিত সাড়ে নয় একরের বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ পার্কের ক্ষেত্রেও এ পরিমাণ ৩৭ ভাগ। ২৩ একরের ওসমানী উদ্যানের নকশায় ধূসর এলাকার পরিমাণ ৫২ ভাগ। ১ দশমিক ২ একরের বনানী পার্কের ক্ষেত্রে তা ৪২ ভাগ। বিআইপি বলছে, উদ্যান-পার্কের উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো, কংক্রিট ও ধূসর এলাকা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিপরীতে উদ্বেগজনক হারে কমছে সবুজ এলাকার পরিমাণ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রকৃতি-পরিবেশ ও সবুজকে ধ্বংস করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং তা সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের গণপরিসরের পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নে পরিকল্পনাগত আদর্শ অনুসরণের বিচ্যুতির ধারাবাহিকতা।
২০১৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা মহানগর এলাকার ড্যাপে ঢাকা ও এর আশপাশে ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য বিভিন্ন ধরনের ৬২টি পার্ক তৈরির পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। আঞ্চলিক পার্ক, ওয়াটার পার্ক হিসেবে এসব পার্ক নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব পার্কে নগরের অধিবাসীদের অবসর বিনোদনের সুযোগ থাকবে। আবার পরিকল্পনা যেভাবে করা হচ্ছে তাতে এসব পার্ক থেকে আয়ের সংস্থানও হবে।
এ প্রসঙ্গে ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় আমরা বিভিন্ন ধরনের ৬২টি পার্কের সংস্থান রেখেছি। পরিকল্পিত এসব পার্ক নগরজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এসব পার্ক ধীরে ধীরে প্রাত্যহিক জীবনযাপনের অংশ হয়ে ওঠার পাশাপাশি এগুলো ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্যও সৃষ্টি হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।’