এই সবকিছু নিয়ে সেজেছে বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত ‘দ্য লং প্রেজেন্ট’ বা ‘বিস্মৃত বর্তমান’। বাংলাদেশের ১৫ জন খ্যাতিমান শিল্পীর চিত্রকর্ম নিয়ে সাজানো হয়েছে এ প্রদর্শনী। আছে বিভিন্ন মাধ্যমে আঁকা বিভিন্ন ধারার চিত্রকর্ম। গ্যালারির দেয়ালজুড়ে আছে শিল্পীদের রঙ, চিত্রভাষা আর গল্পের সমাহার।
একজন দর্শক একটি ছবিকে দেখতে পারেন নিজের মতো করে। তার কাছে ছবি ধরা দেয় তার মনের ভেতরে থাকা রঙে। তবে নিশ্চিতভাবে নাজলী লায়লা মনসুরের ‘শিমুল’ দর্শককে মনে করিয়ে দেবে গাছভর্তি শিমুলের কথা। ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিকে আঁকা ৪৮×৪৮ ইঞ্চির ছবিটি শিমুলের বৃহত্ত্বকে মনে করিয়ে দেয়। এর খুব কাছেই আছে আরেকটি ছবি—‘ব্লুম’। অ্যাক্রিলিকে আঁকা ফুটন্ত ফুলের এ কম্পোজিশন মনে করিয়ে দেয় সালভাদর দালির গলিত ঘড়ির আবহ।
গ্যালারির দেয়ালে দেয়ালে আছে নামজাদা শিল্পীদের ছবি। জলরঙে আঁকা হাশেম খানের ‘রাত্রিতে কাক’ অনেকটা হরর আবেশ তৈরি করে। মনে করিয়ে দেয় এডগার অ্যালান পোকে। অন্যদিকে অ্যাক্রিলিকে আঁকা ৪২×৩৬ ইঞ্চির ‘ইলিশের ঘর মেঘনা’ দেখে রুপালি ইলিশ আর মেঘনা নদী জীবন্ত হয়ে ওঠে। একদিকে মেঘনার নীল জল, অন্যদিকে অ্যাক্রিলিকে আঁকা ‘লাল সংগীত’-এর লাল রঙ জ্বলজ্বল করে।
একটু ঘুরতেই এক দেয়ালে দেখা যায় রফিকুন নবীর চারটি কাজ। অ্যাক্রিলিকে আঁকা ‘কম্পোজিশন অব গোটস’; আছে ‘টোকাই’ সিরিজের তিনটি ছবি। এ সিরিজের দুটি ছবিতে টোকাইকে দেখা যায় কাক ও টিয়ার সঙ্গে।
একটু ঘুরলেই ফরিদা জামানের তিনটি চিত্রকর্ম চোখে পড়ে। ঘন নীল রঙে জলের ভেতর মাছ—ছবির নাম ‘সংস অব ওয়াটার’; মাছ ধরার পলো ও জাল নিয়ে ‘মাই কান্ট্রি’ ও ‘ফিশিং নেট’। তিনটি ছবিই অ্যাক্রিলিকে আঁকা। বাংলাদেশকে নিজের ছবিতে তুলে ধরতে চান ফরিদা জামান। নিজের ছবি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি মূলত ফিশিং নেট, বাংলাদেশ, ফ্যামিলি নিয়েই কাজ করি। আমি বাংলাদেশকে উপস্থাপন করি আমার কাজের মধ্যে। এ ছবিগুলোতেও সেই কাজটিই করেছি।’
প্রদর্শনী নিয়ে তিনি বলেন, ‘এ প্রদর্শনীতে সিনিয়র অনেক শিল্পী আছেন। আবার আমার ছাত্ররাও আছেন। বেঙ্গল গ্যালারি অনেকদিন পর এমন একটা প্রদর্শনী করছে, সেজন্য তাদের ধন্যবাদ।’
আরেকটু হাঁটলে দেখা গেল এক নামের তিনটি ছবি—একটি সিরিজ। রণজিৎ দাশের। যাপিত জীবন, জটিলতা, গভীরের একাকিত্ব এসেছে ছবি তিনটিতে। ‘স্টোরি অব লাইফ’ সিরিজ তিনি এঁকেছেন ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক দিয়ে। ছবিগুলোর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক যেমন চোখে পড়ে, তেমনি দেখা যায় ভিন্ন রঙের উপস্থিতি ও প্রাধান্য।
চোখের দেখাতেই দৃশ্যপট ও গল্প বুঝে নেয়া যায় জামালউদ্দিন আহমেদের ছবির। একটি ছবি বুড়িগঙ্গার। আমাদের চেনা এ নদীকে তিনি উপস্থাপন করেছেন অ্যাক্রিলিকে। ৪২×৭২ ইঞ্চির বৃহৎ ছবিটিতে আছে নীল জল, দাঁড় টানা নৌকা, ছোট লঞ্চ ও এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। ছবিটির মজার ব্যাপার হলো, স্টিমারও যোগ করেছেন শিল্পী।
এছাড়া আছে তার ‘শাপলা’। ডুবন্ত নৌকা আর শাপলার বিল যেন সময়কে থামিয়ে দেয়। ‘জিপসি ওম্যান’ আবারো নতুন করে দেখতে বলে বেদেনীদের। সার বাঁধা নৌকার ব্যাকগ্রাউন্ডে সার বেঁধে হেঁটে যাওয়া নারীরা একটি জীবন ও একটি সম্প্রদায়ের উপস্থাপনা।
জামালউদ্দিন আহমেদ জানান, নিজের দেখার অভিজ্ঞতা থেকে ‘জিপসি উইমেন’ এঁকেছেন। তিনি বলেন, ‘যখন আউটডোরে যেতাম, তখন জিপসি বোটগুলো দেখতাম। দিনের শেষে ওরা ঘরে ফিরত। নৌকাই তাদের ঘর। তাদের দেখতে ভালো লাগত। খুব রঙিন। চুলে ফিতা বেঁধে সাজগোজ করে থাকত। ওদের ঘরে ফেরার দৃশ্যটিই আমার মাথায় ছিল, সেটাই এঁকেছি। নেপথ্যে দেখা যাবে কেউ বসে আছে নৌকায়। ওদের পুরো জীবনের একটা চিত্র এ ছবি।’
গ্যালারির শেষ দেয়ালে দেখা যাবে মিশ্র মাধ্যমে আঁকা শিশির ভট্টাচার্যের ‘দ্য পিকচার’। আধুনিকতা, বিদ্রূপ ও ক্যারিকেচার স্থান পেয়েছে এ ছবিতে। তার পাশেই মোহাম্মদ ইউনুসের তিনটি কম্পোজিশন দেখা যাবে দেয়ালের একদিকে। তিনটিরই আকার ১৪৪×৩০ ইঞ্চি। মিশ্র মাধ্যমে অঙ্কিত এ তিন ছবিতে রঙ, ছোপ আর গল্প লুকিয়ে আছে।
প্রদর্শনী নিয়ে মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, ‘এ প্রদর্শনীর উল্লেখযোগ্য দিক হলো এখানে প্রায় চার প্রজন্মের শিল্পীদের চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। হাশেম খান স্যার, রফিকুন নবীর চিত্র যেমন আছে, তেমনি তাদের ছাত্রদেরও ছবি আছে। ফলে এ প্রদর্শনী একটি মহামিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।’
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনেন মোহাম্মদ ইউনুস। তিনি বলেন, ‘প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া অনেক শিল্পীই প্রবীণ, কিন্তু তাদের ছবিগুলো বর্তমানের কথা বলে। এমনকি কিছু ছবি ভবিষ্যতের কথাও বলে।’
মিশ্র মাধ্যমে আঁকা কনকচাঁপা চাকমার ‘ব্রেথ অব স্প্রিং’ অবশ্যই বসন্তকে মনে করিয়ে দেয়। অ্যাক্রিলিকে আঁকা ‘মিউজিক অব আর্ট’ সংগীত ও সত্তার গল্প। সবচেয়ে মনে ধরে ‘মুন ফেস্টিভ্যাল’।
মাকসুদা আক্তার নীপার তিনটি ছবি ‘পেইন্টিং’ শিরোনামের। রঙের ঔজ্জ্বল্য আর বিন্যাসে চমৎকার। তেলরঙে মোহাম্মদ ইকবালের ‘আনফেটার্ড লাইফ’ এ উপমহাদেশের সাধু-সন্ন্যাসীদের মনে করায়। এ ছবির তুলনায় তার ‘হোলি সার্কেল’ ও ‘পিস ইন দ্য টাইম অব ডিসকুইয়েট’ ভিন্ন ধারার।
বিশ্বের ক্ষয়িষ্ণু জলবায়ু ও প্রকৃতির প্রসঙ্গ এসেছে কামাল উদ্দিনের ছবিতে। দুর্ভিক্ষপীড়িত (সম্ভবত) শিশুর মুখ ঢাকা পৃথিবীর মানচিত্র, ফাটা গ্লোবের ওপর দাঁড়ানো জোকার এ বিশ্বের প্রকৃতি ও মানুষের দুরবস্থার প্রকাশ।
প্রদর্শনীর বেশির ভাগ ছবিই সাম্প্রতিক। কিছু বিষয় এমন উঠে এসেছে, যা বর্তমান, কিন্তু আমরা লক্ষ করি না। সে কারণেই হয়তো প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘বিস্মৃত বর্তমান’।
শেষ করা যাক আবদুস শাকুর শাহর তিনটি ছবির কথা বলে। প্রদর্শনীতে আছে তার ‘গ্রামের গল্প’ সিরিজের দুটি ছবি। পটচিত্রের মতো করে আঁকা ছবিগুলো গ্রামীণ মানুষ, তাদের জীবন ও যাপন প্রকাশ করে। ছবির ভেতরে শিল্পী রেখেছেন টেক্সট। তৃতীয় ছবি ‘কাজলরেখা’। অ্যাক্রিলিকে আঁকা তিনটি ছবি ও তার টেক্সট আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় মৈমনসিংহ গীতিকার কাছে। সেটিও হয়তো আমাদের বিস্মৃত বর্তমান।