এক অন্তর্লীন যাত্রা— দ্য কোয়ায়েট উইদিন

আলো অন্ধকারে মাথার ভেতরে এক বোধ কাজ করত জীবনানন্দের। সে কথা তার লিখে যাওয়া কবিতা থেকে আমরা উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। এ চেষ্টা থেকে একটা প্রশ্ন মাথায় আসে, আমাদের মাথায় কী কাজ করে।

সবারই নিশ্চয় বিশেষ কোনো না কোনো ‘বোধ’ আছে; তবে তার চেয়েও বেশি আছে বৈষয়িক চিন্তা। কখনো সেসব চিন্তা মগজে শাখা-প্রশাখা গড়ে তোলে। দর্শন করা গেলে সেটি হতো ‘হিজিবিজি’ কতগুলো রেখার সমষ্টি। চিন্তার এ জট খুলতে মানুষকে সাহায্য করে কিছুটা অবসর, বিস্তীর্ণ কোলাহলমুক্ত পরিসর। আর সেই পরিসর যদি হয় সবুজে ঘেরা, প্রবহমান জলধারার সন্নিকটে তাহলে মানবমন যেন এক অন্তর্লীন যাত্রায় ধাবিত হতে চায়; আকাশলীনা হতে চায়। ‘দ্য কোয়ায়েট উইদিন’ প্রদর্শনীতে গিয়ে তেমন এক মানসিক যাত্রার অনুভব হলো। শিল্পী রাশেদ জামানের প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী এটি। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে গত ১৩ আগস্ট বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান প্রদর্শনী কক্ষে প্রদর্শনীটির উদ্বোধন হয়।

আলোকচিত্রে গ্রামীণ দৃশ্য ধারণ করেছেন শিল্পী

প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া শিল্পকর্মগুলোকে কেবল আলোকচিত্র বলা যাচ্ছে না। কেননা সেখানে ব্যবহৃত হয়েছে ‘মিক্সড মিডিয়া আর্ট টেকনিক’। গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই হাতের বাঁয়ে নজর কাড়ে দেয়ালে সাঁটানো দুটি ছবি। সেখানে দেখা যাচ্ছে সূর্যের আভায় ছেঁয়ে যাওয়া বিস্তীর্ণ ভূমি, মেঠোপথ। সেই পথে মহিষরা মেষপালক হয়েছে, ঘরে নিয়ে যাচ্ছে ভেড়ার দলকে। সেখানে শৃঙ্খলা আছে, সঙ্গে আছে কোমল মায়া। এগুলো দেখতে গিয়ে মনে দ্বিধা জাগে ছবিগুলো আলোকচিত্র নাকি পেইন্টিং। এ দ্বিধা বেড়ে যায় অন্য এক দেয়ালে টাঙানো পানিতে প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি দেখে। মূলত ক্যানভাসে ছবিগুলোর প্রিন্ট নিয়ে তার ওপর রঙতুলির আঁচড়ও দিয়েছেন শিল্পী রাশেদ জামান। ফলে ছবিগুলো আরো জীবন্ত রূপ পেয়েছে, যা আকাঙ্ক্ষা জাগায় দুদণ্ড অবসর-যাপনের। নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া সেরে নেয়ার, ফেলে আসা স্বপ্ন কীভাবে পূরণ করা যায় তা ভাবার। যেমনটি করেছেন রাশেদ জামান নিজেই।

শিল্পীর এ বক্তব্য ও চলমান প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলো আরো একটি জরুরি বিষয়কে মনে করিয়ে দিচ্ছে। শিল্প বা চিত্রচর্চায় ‘স্পেস’ গুরুত্বপূর্ণ। স্পেস কেবল কংক্রিট বস্তু দিয়ে তৈরি হয় না। সেটি হয় ফ্রেম দিয়ে। কখনো কেবল আলো দিয়ে দৃশ্যমান স্পেস তৈরি করা যায়। সেই স্পেস স্থিতিশীলতা বা গতিশীলতার অনুভব দিতে পারে

প্রদর্শনীর আলো-আঁধারিতে এক দর্শনার্থী

আলোকচিত্র ও পেইন্টিং-এ দুইয়ের সমন্বয়ের চিন্তা কখন এল জানতে চাইলে শিল্পী জানান, ‘এটা কোনো পরিকল্পিত চিন্তা নয়। আমার ছোটবেলা থেকেই একটা ইচ্ছা ছিল—আমি বড় হয়ে পেইন্টার হতে চাই। আবদুর রাজ্জাকের একটা পেইন্টিং দেখে প্রথম মনে হয়েছিল—আচ্ছা, মেঘের ফাঁক দিয়ে রোদ আসে! সেখান থেকে এক ধরনের আলো দেখেছিলাম। তারও আগে একটা দৃশ্য আমার খুব মনে পড়ে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতাম, আমার নানা সবসময় জানালার পাশে খালি গায়ে বসে লেখালেখি করছেন। পূর্ব দিক থেকে যে আলোটা এসে তার গায়ে পড়ত, সেটা আবার প্রতিফলিত হয়ে একটা গ্লো (ঔজ্জ্বল্য) তৈরি করত। বিষয়টা আমার খুব ভালো লাগত। তখন অবশ্য এসবের কোনো টার্ম জানতাম না। কিন্তু তখন থেকেই আলো কীভাবে কাজ করে, একটা স্পেসের গুণ বা অনুভূতি কীভাবে বদলে যায়—এসব বিষয় আমার ভালো লাগত।’

এসব দেখে শিল্পীর মনে হয়েছিল, তিনি পেইন্টার হতে চান। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। সময় ও ঘটনা পরিক্রমায় তিনি সিনেমাটোগ্রাফার হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি তুলি চালাতে, রঙ ব্যবহার করতে জানি না। কিন্তু ক্যামেরা ও লেন্স বুিঝ। তাই আমার ক্যামেরা আর লেন্সই তুলি ও রঙের জায়গাটা নিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টা পেইন্টার হওয়া বা না হওয়া নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো আমি আবেগ প্রকাশ করতে চাই। ভেতরে যা আছে তা প্রকাশ করতে চাই।’

বিস্তীর্ণ খালি মাঠের মাঝে একলা গাছ

শিল্পীর এ বক্তব্য ও চলমান প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলো আরো একটি জরুরি বিষয়কে মনে করিয়ে দিচ্ছে। শিল্প বা চিত্রচর্চায় ‘স্পেস’ গুরুত্বপূর্ণ। স্পেস কেবল কংক্রিট বস্তু দিয়ে তৈরি হয় না। সেটি হয় ফ্রেম দিয়ে। কখনো কেবল আলো দিয়ে দৃশ্যমান স্পেস তৈরি করা যায়। সেই স্পেস স্থিতিশীলতা বা গতিশীলতার অনুভব দিতে পারে। প্রদর্শনীর ছবিগুলোয় আলোর বহুমাত্রিক ব্যবহার বেশ স্পষ্ট, যা সাবজেক্টের পুনরাবৃত্তি সত্ত্বেও ছবিগুলোকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। তাছাড়া আলোকচিত্রের ভাষা গড়তে আলো-ছায়া কতটা মুখ্য ভূমিকা রাখে সেটাও প্রদর্শনী দেখার সময় অনুভব করা যায়। সব মিলিয়ে শিল্পী ও তার চিত্রকর্মগুলো যেন দর্শনার্থীকে ডাকতে চাচ্ছে,

‘বন্ধু এসো স্বপ্ন আঁকি চারটা দেয়াল জুড়ে

বন্ধু এসো আকাশ দেখি পুরোটা চোখ খুলে

বন্ধু এসো জলে ভাসি বুক ভাসানোর সুখে’

আরও