অনুমানে কেনা ছবিই যখন রুবেনসের মাস্টারপিস

শিল্পকলার জগতে মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা রূপকথাকেও হার মানায়।

শিল্পকলার জগতে মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা রূপকথাকেও হার মানায়। উত্তর ইউরোপের তুলনামূলক কম পরিচিত এক নিলামঘরে ধুলো জমা অবস্থায় পড়ে ছিল দাড়িওয়ালা এক বৃদ্ধের তেলচিত্র। ক্যাটালগে ছবিটির পাশে কোনো বিখ্যাত শিল্পীর নাম ছিল না; কেবল লেখা ছিল ‘ফ্লেমিশ স্কুল’-এর একজন অজ্ঞাত শিল্পীর কাজ। কিন্তু বেলজিয়ান আর্ট ডিলার ক্লাস মুলার যখন সেই ছবির দিকে তাকালেন, তিনি সেখানে সাধারণ কোনো ক্যানভাস দেখেননি। তার অভিজ্ঞ চোখ সেখানে দেখতে পেয়েছিল মহাকালের এক লুকানো স্বাক্ষর। সেই অদম্য কৌতূহল থেকেই শুরু হয় এক রোমাঞ্চকর যাত্রা, যা শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যাওয়া এক মাস্টারপিসকে বিশ্বের সামনে নিয়ে এসেছে।

তিন বছর আগে নিলামঘরের ওয়েবসাইটে ছবিটি দেখে থমকে গিয়েছিলেন ক্লাস মুলার। এটি কাগজের ওপর তেলরঙে আঁকা, যা পরে কাঠের প্যানেলে বসানো হয়েছে। নিলামঘরটি শিল্পীর নাম বা ছবিটি ঠিক কবে আঁকা সে বিষয়ে কোনো তথ্য উল্লেখ করেনি। মুলার বুঝতে পেরেছিলেন যে এটি যদি সত্যিই বড় কোনো শিল্পীর কাজ হয়, তবে জানাজানি হলে এর দাম নাগালের বাইরে চলে যাবে। তাই শিল্প সংগ্রাহকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ার ভয়ে তিনি নিলামঘরের কাছে ছবিটির বাড়তি কোনো তথ্য বা স্পষ্ট ছবিও চাননি। বরং গোপনীয়তা বজায় রেখে ফোন ও অনলাইনে অংশ নিয়ে ১ লাখ ১৬ হাজার ৩০০ ডলারে ছবিটি কিনে নেন। অজ্ঞাত শিল্পীর একটি ছবিতে এত টাকা খরচ করা ছিল তার জীবনের অন্যতম বড় এক ঝুঁকি।

মুলার কেন ছবিতে বাজি ধরেছিলেন, উত্তরটা লুকিয়ে ছিল তার দীর্ঘদিনের শিল্পবোধে। ছবিটি নিজের সংগ্রহে আনার পর মুলার দ্বারস্থ হন রুবেনস হাউজের প্রাক্তন পরিচালক ও প্রখ্যাত শিল্প ইতিহাসবিদ বেন ভ্যান বেনেডেনের। নিবিড় গবেষণার পর বেনেডেন জানান, ছবিটির কারিগরি দক্ষতা অবিশ্বাস্য। এটি আঁকতে রুবেনস অত্যন্ত পরিমিত রঙ ব্যবহার করেছেন, অথচ প্রতিটি আঁচড় ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।

গবেষণায় বেরিয়ে আসে আরো একটি চমকপ্রদ তথ্য। রুবেনস এখানে পুরনো কাগজ ব্যবহার করেছিলেন। ক্যানভাসটি উল্টো করলে বৃদ্ধের দাড়ির রেখার আড়ালে একজন নারীর আবছায়া মুখ দেখা যায়। এটি রুবেনসের উপাদানের প্রতি তার চিরচেনা সৃজনশীল ও কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিরই বহিঃপ্রকাশ।

চিত্রকর্মটি বর্তমানে ‘বেয়ার্ডেড ওল্ড ম্যান, লুকিং ডাউন টু হিজ লেফট’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। ক্লাস মুলারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৬০৯-১১ সালের মধ্যে রুবেনস তার বেশকিছু কালজয়ী ছবি আঁকার সময় বৃদ্ধের অবয়বকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

১ লাখ ১৬ হাজার ডলারে কেনা ছবিটির দাম এখন কয়েক মিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে বলে ধারণা করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। উল্লেখ্য, এর আগে রুবেনসের এমন একটি স্কেচ প্রায় ৮২ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছিল। চলতি মাসে ব্রাসেলসের বিখ্যাত ‘ব্রাফা আর্ট ফেয়ারে’ প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে ছবিটি।

সূত্র ও ছবি: আর্ট নিউজ

আরও