চার্লস ফাজিনো থ্রিডি পপ আর্টের জাদুকর

চার্লস ফাজিনো সমসাময়িক আমেরিকান পপ আর্টের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি তার থ্রি-ডাইমেনশনাল (থ্রিডি) পপ আর্ট শৈলীর মাধ্যমে শিল্পজগতে এক অনন্য ভাষা নির্মাণ করেছেন।

নিউইয়র্ক শহরের প্রাণচাঞ্চল্য, বিশ্বখ্যাত স্থাপত্য, ক্রীড়া, সংগীত ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির রঙিন কোলাজ তার শিল্পকর্মের মূল উপজীব্য। উজ্জ্বল রঙ, সূক্ষ্ম স্তরবিন্যাস ও কাগজ-কাটার কারুকাজে নির্মিত তার শিল্পকর্ম দর্শককে শুধু দেখার অভিজ্ঞতা নয়, বরং একটি জীবন্ত শহুরে আনন্দের ভুবনে নিয়ে যায়। আশাবাদ, গতিময়তা ও কল্পনার সমন্বয়ে ফাজিনোর শিল্প আধুনিক পপ আর্টকে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা, যা তাকে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ও সংগ্রাহকদের প্রিয় শিল্পীতে পরিণত করেছে। বিশ্বজুড়ে তাকে পপ আর্টের অন্যতম স্রষ্টা হিসেবে গণ্য করা হয়।

শিক্ষাজীবন ও প্রেরণা

ফাজিনোর জন্ম ১৯৫৫ সালে। ছেলেবেলা থেকে তার ছিল শিল্পের প্রতি আগ্রহ। সেখান থেকেই ভিজুয়াল আর্টে পড়াশোনা। ১৯৭৭ সালে নিউইয়র্কের স্কুল অব ভিজুয়াল আর্টস থেকে পড়াশোনা শেষ করেন তিনি। প্রাথমিক জীবনে অনেকেই ছিলেন তার অনুপ্রেরণা। ক্যারিয়ারের শুরুতে বাবার পরামর্শ তার সাফল্যের অন্যতম পাথেয় হিসেবে কাজ করে। বাবা সালভাতোরে ফাজিনো ছিলেন জুতা নকশাকার। তিনি ছেলেকে একেবারে সোজাসাপ্টা একটি পরামর্শ দিয়েছিলেন। ফাজিনো বলেন, ‘বাবা আমাকে বলেছিলেন, ‘‘যদি তুমি শিল্পী হতে চাও এবং সফলও হতে চাও, তাহলে তোমাকে অবশ্যই এমন কিছু করতে হবে যা অন্যদের থেকে আলাদা।’’ আমি কথাটা মন থেকে গ্রহণ করেছিলাম।’

শিল্পী জীবনে পরিবারই ছিল তার বড় প্রেরণা। একটা সময়ে মায়ের সহযোগিতায় নিজের কাজের বিশেষ ও আলাদা ক্ষেত্র খুঁজে বের করেন চার্লস ফাজিনো। সেটি হলো ত্রিমাত্রিক পপ আর্ট। তার শিল্পকর্মে দেখা যায় উজ্জ্বল রঙ, প্রাণচঞ্চলতা ও আধুনিকতায় ভরা ধারণা, যেখানে স্তর, খণ্ডাংশ এবং নানা ধরনের উপকরণ ব্যবহার করে কাজগুলোকে দেয়া হয় অপ্রত্যাশিত ব্যাপ্তি ও গভীরতা। তার বহুস্তরভিত্তিক কৌশলে শিল্পকর্মকে স্পর্শযোগ্য বলে মনে হয়। তার কাজের বিষয়বস্তুতে বেশির ভাগ সময়ই উঠে আসে সমসাময়িক বাস্তবতা, বড় বড় আয়োজন, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং শহুরে জীবনচিত্র।

শুরুর সংগ্রাম

ফাজিনোর বাবা-মা ছিলেন পপ আউট বইয়ের সংগ্রাহক। তিনি বলেন, ‘আমি সেই বইগুলোতে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।’ পরে একটি বিড়ালকে নিয়ে নিজেও একটি পপ আউট বই তৈরি করেছেন। কিন্তু বইটি অপ্রকাশিত থেকে যায়। ১৯৮২ সালের দিকে ফাজিনো কাজের সংকটে ভোগেন। তার মা আইরিন একজন ভাস্কর। তখন মা নিউইয়র্কে গ্রিনউইচ ভিলেজের এক শিল্প প্রদর্শনীতে অংশ নিতে তাকে উৎসাহ দেন। প্রকাশ না হওয়া সেই পপ আউট বইয়ের কয়েকটি পাতা ছিঁড়ে ফ্রেমে বাঁধিয়ে প্রদর্শনীতে রাখেন ফাজিনো। এরপর মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকেন। তিনি বলেন, ‘সমতল ছবিগুলো কেউ কেনেনি, কিন্তু এর থ্রিডি কাজগুলো প্রথম দিনেই সবাই কিনে নিয়েছিল। তখনই বুঝলাম, আমি নতুন এক শিল্পরূপ খুঁজে পেয়েছি।’

কাজের ক্ষেত্র, বিস্তৃতি ও খ্যাতি

এলভিস প্রিসলি, মেরিলিন মনরো কিংবা ডিজনি চরিত্রসহ বহু পপ সংস্কৃতির আইকন তার শিল্পকর্মের বিষয়। এর পরও চার্লস ফাজিনো ক্রীড়া দল ও ক্রীড়ানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে করা কাজের জন্য মূলত বেশি পরিচিত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পেশাদার সবচেয়ে বড় ফুটবল আয়োজন ন্যাশনাল ফুটবল লিগের (এনএফএল) সুপার বোলের ৬০তম আসরের অফিশিয়াল শিল্পী। এনএফএলের সঙ্গে এ ভূমিকায় এটি তার ২৬তম মৌসুম।

এছাড়া তিনি টানা ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মেজর লিগ বেসবলের অলস্টার গেমের অফিশিয়াল শিল্পী। অলিম্পিক গেমস, দুটি ফিফা বিশ্বকাপ, পাঁচটি ডে-টাইম এমি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান এবং গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের সঙ্গেও তিনি একই ভূমিকায় যুক্ত ছিলেন। চলতি বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের অফিশিয়াল শিল্পীও তিনি।

ফাজিনোর শিল্পকর্ম সংগ্রাহকদের তালিকায় রয়েছেন বেসবল তারকা বার্নি উইলিয়ামস ও মারিয়ানো রিভেরা, আমেরিকান ফুটবলের পেটন ও ইলাই ম্যানিং, টম ব্র্যাডির বাবা থেকে শুরু করে বিনোদনজগতের বহু তারকা। ফাজিনোর ভাষায়, প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ছিলেন তার প্রথম দিককার খ্যাতনামা সংগ্রাহকদের একজন। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো ম্যাডোনার সঙ্গে দেখা করিনি, কিন্তু জানি তিনি আমার কিছু শিল্পকর্মের মালিক।’ এছাড়া সেলেনা গোমেজ ও বেনি ব্ল্যাঙ্কোর বিয়েকে স্মরণ করে একটি শিল্পকর্ম তৈরির অনুরোধও পেয়েছিলেন তিনি।

ফাজিনোর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আমেরিকান এয়ারলাইনস টার্মিনালে কাচের কেসে রাখা আছে ১২ ফুট ডানাবিশিষ্ট ঝলমলে বিমানের মডেল। লাগেজ ক্লেইমের এসকেলেটরের ওপরে রাখা আছে ২৫ ফুট উঁচু একটি দেয়ালচিত্র। তিনি হোয়াইট হাউজ হিস্টোরিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের জন্যও শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন। ফাজিনোর শিল্পকর্ম বিক্রি হয়েছে বিশ্বের ৩৫টি দেশে। তার ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ২৫০টি আন্তর্জাতিক ক্রুজ জাহাজে তার কাজ প্রদর্শিত হচ্ছে। ৭০ বছরে পা দেয়া ফাজিনো বলেন, ‘এটা ভীষণ তৃপ্তিদায়ক। আমি বুঝেছিলাম আমি সঠিক পথে আছি, কারণ আমার কাজ সাধারণ শিল্পের চেয়ে একেবারেই আলাদা দেখায়। এটা মজার, রোমাঞ্চকর। মানুষ বলে, এটা দেখলে তাদের ভালো লাগে।’

ফাজিনোর ত্রিমাত্রিক শিল্পকৌশল স্তরের পর স্তর জোড়া লাগানো একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। প্রতিটি কাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিং ও গ্লু করে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি যেকোনো কাজই করি না কেন, তাতে কাটাকুটি আর আঠা লাগানোর পেছনে অসংখ্য ঘণ্টা লেগে যায়। আমি প্রিন্টের দুই বা তিনটি স্তর কেটে নিতাম, সেগুলো একসঙ্গে আঠা দিয়ে লাগাতাম, তারপর বিশেষ ধরনের সিলিকন ব্যবহার করে সেগুলোকে ত্রিমাত্রিক করে তুলতাম। দূর থেকে তাকালে মনে হয় কাজটা যেন ভেসে আছে। এক অর্থে এটি প্রায় ভাস্কর্যের মতোই দেখায়।’

বর্তমানে ১২ জন শিক্ষানবিশ শিল্পী নিয়ে কাজ করেন ফাজিনো। এর মধ্যে ছয়জন পূর্ণকালীন। তার একটি শিল্পকর্মে তিন হাজার পর্যন্ত আলাদা অংশ থাকে, এগুলোর সবই হাতে তৈরি। তিনি সিল্ক স্ক্রিন প্রিন্ট (সেরিগ্রাফ) ছাড়াও কাজ করেন অলংকৃত ব্যাট, হেলমেট ও বলের মতো অপ্রচলিত থ্রিডি মাধ্যমে। সুপার বোল স্মরণে এনএফএল একবার তাকে পুরনো খেলাধুলার সরঞ্জামের বাক্স পাঠিয়েছিল। গাড়ির রঙ ও গ্লেজ ব্যবহার করে তিনি সেগুলোকে ভাস্কর্যসম শিল্পে রূপ দেন।

চার্লস ফাজিনোর শিল্পভাষা হলো উজ্জ্বল রঙ, স্তরবিন্যাস ও ত্রিমাত্রিক গঠন দিয়ে জীবন্ত শহুরে নানা বিষয়ে গল্প উপস্থাপনের ক্ষমতা। তার কাজ কেবল তাৎক্ষণিক চোখের আনন্দই দেয় না, বরং দর্শককে এক গতিশীল, স্পর্শযোগ্য ও কল্পনাময় অভিজ্ঞতায় নিমগ্ন করে। পপ সংস্কৃতির আইকন থেকে ক্রীড়া উৎসব পর্যন্ত, ফাজিনোর থ্রিডি শিল্প আধুনিক পপ আর্টকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, যা তাকে সমকালীন শিল্পজগতের এক অনন্য অবস্থানে স্থাপন করেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

আরও