অথবা মাথায় আসবে মহাকবি গ্যাটের সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘মানুষ তা-ই শোনে যা সে শুনতে চায়।’ প্রশ্ন উঠবে আমরা দর্শক হিসেবে কোন রিয়েলিটিতে আছি? কিংবা শিল্পী কোন রিয়েলিটির মধ্যে আমাদের প্রবেশ করিয়ে কী মনে করিয়ে দিতে চাইছেন? এমনকি একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠবে শিল্পীর নিজস্ব রিয়েলিটি নিয়েও। আর প্রদর্শনীতে আমরা যতই এগোতে থাকব, বুঝতে পারব, এ প্রদর্শনী আমাদের দেখাচ্ছে কীভাবে তথ্য-উপাত্ত, আকাঙ্ক্ষা এবং পরম (চূড়ান্ত অর্থ)—এ তিনটি স্তর একে অপরের সঙ্গে গোপন ও নিরবচ্ছিন্ন সংলাপে থাকে।
দুই.
গ্যালারির বাম পাশের দরজা পার হয়ে ভেতরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চোখে আসে কিছু ক্যালাইডোস্কোপিক স্থির চিত্র। যেখানে আপাতদৃষ্টিতে দেখা মিলবে প্রাণ-প্রকৃতির, কিন্তু সেগুলো প্রকৃতির অনুকরণ তো নয়ই বরং এমনভাবে সাজানো যে পরের ধাপেই একজন দর্শক বাধ্য হবেন প্রকৃতির মধ্যে এমন কোনো ফর্ম খুঁজতে যা তার চেনা অথবা চেষ্টা করবেন নিজের পরিচিত কোনো ইমেজ বা ফর্মের সঙ্গে মিলিয়ে প্রদর্শনীর ছবিগুলোকে বুঝতে। একটু সামনে এগিয়েই যখন ছোট্ট রুমটার দিকে যাবেন সেখানে দেখা মিলবে একটি ভিডিও স্থাপনাধর্মী শিল্পকর্মের। সেখানে প্রকৃতিকে দেখা যাবে ভিন্ন রূপে। ভিন্নতা বা পার্থক্যের জায়গা হলো এখানে ভিডিওচিত্রের সঙ্গে কোনো শব্দ নেই। বাতাসের মধ্যে গাছের নিচে একটা ছোট্ট শিশু হাত নেড়ে কোনো বাস্তবতাকে বিদায় জানাচ্ছে নাকি আলিঙ্গন করছে সেটা দর্শককে দ্বিধাগ্রস্ত করবে। এখানে কম্পোজিশন তিন স্তরে সাজানো। প্রথম স্তরে শিশুটি স্ক্রিনের মধ্যে হাত নাড়ছে, দ্বিতীয় স্তরে দুটি রুপার মানুষের মাথা ঘুরে চলেছে। আর তৃতীয় স্তরে একটা নদীর মধ্যে ছোট্ট ভেসে যাওয়া নৌকার স্থির চিত্র। কিন্তু আরো একটা স্তর দর্শকের খুব কাছেই এ স্থাপনার নিচের অংশে রয়েছে যেখানে বাংলাদেশের নদী, নৌকাসংবলিত আরেকটি ভিডিও। ভিডিওটা কিছুটা গ্লুমি। স্থাপনা শিল্পের উপস্থাপনের ধরন এমন যে ছোটো রুমটা যেন আরো আবদ্ধ হয়ে আছে এ রকম অনুভূতির দিকে নিয়ে যায়। ফলে দর্শক আগের রুম থেকে এ রুমের মধ্যে প্রবেশ করলে তিনি ঠিক কোন রিয়েলিটির মধ্য দিয়ে এ বিষয়ের সঙ্গে সংযোগ করবেন তা নিয়ে সংশয় তৈরি হবে।
এর পরের রুমে প্রবেশ করলে আরো দ্বিধান্বিত হতে হয়। এখানকার উপস্থাপনার ধরন রুমটাকে আরো বিশাল করে তোলে। কারণ রুমের দেয়ালের তিনপাশ মিলিয়ে চলছে একটাই ভিডিও। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আছে। আর ভিডিওতে একের পর এক আসতে থাকবে খোলা প্রান্তরে বয়ে যাওয়া বাতাসের সঙ্গে মেঘের ছোটাছুটি, কখনোবা শুধুই মেঘের রাজ্য, দিনের আলোয় সমুদ্রের ঢেউ অথবা সমুদ্রে সন্ধ্যা নামছে। অরণ্যে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে, আবার সূর্যালোকিত সুন্দর শুভ্র অরণ্য কিংবা গ্রামের মধ্য দিয়ে যাত্রা আবার জানালার গ্লাসে বৃষ্টির পানির ফোঁটা। সমুদ্রে বজ্রপাত, পানিতে বৃষ্টির পানির ফোঁটা কিংবা পানিতে আলোর প্রতিফলন ইত্যাদি। তিনদিক থেকে ভিডিওটা চলার কারণে অপটিক্যাল ইল্যুশন এবং শব্দের আবহে দর্শক এর অংশ হয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু এ সবকিছুই আবার এমনভাবে একটা থেকে আরেকটায় রূপান্তরিত হচ্ছে যেন গ্যালারির প্রথম রুমের স্থিরচিত্রগুলো আরো ব্যাপকতা নিয়ে দর্শকের দিকে ছুটে আসছে। আবার কখনোবা দর্শকের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যা অনায়াসে মনে করাবে ‘ফ্রানৎস কাফকা’র ‘মেটামরফোসিস’-এর কথা। এমনকি এর পেছনের দেয়ালে দুটি চলমান (মুভিং) যন্ত্রকৌশলের দ্বারা সৃষ্ট স্থির চিত্র, যা প্রথম দেখায় পুরাণের দেব-দেবীর আদলে দেখা গেলেও দর্শকের নিজের অভিজ্ঞতার প্রক্ষেপণ ছাড়া সে দুটোকে চিনতে যে কষ্ট দেয় সেটাও ওই অনুভূতির অংশ হয়ে যায়। বিশ্বব্যাপী দৃশ্যশিল্পের সাম্প্রতিক প্রবণতা হিসেবে ইমার্সিভ আর্টের যে প্রচলন আমরা দেখি এ শিল্পকর্মটি তার সার্থক রূপায়ন। যেখানে দর্শক শিল্পীর তৈরি করা পরিবেশের মধ্য দিয়ে অনুভূতির এমন এক তুরীয় স্তরে পৌঁছেন যে ভাষারূপে সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা প্রায় অসম্ভব।
অর্থাৎ প্রত্যেকটা পর্যায়ে শিল্পকর্মগুলো দর্শককে দ্বিধাগ্রস্ত করবে, প্রশ্নের মুখে ফেলবে, ভাবতে বাধ্য করবে। যেনবা সবই চেনা, সবই জানা অথচ অধরা। এমনকি গ্যালারির বাকি দুটো রুমের শিল্পকর্মও এ রকম। একটিতে ভিডিওধর্মী স্থাপনা শিল্প, যেখানে প্রথম স্তরে মানবমস্তিষ্কের লাইভ স্ক্যানিং, পরের ধাপে মাণ্ডালা টাইপের প্রজেকশন আর সর্বশেষ স্তরে আছে রক্তাক্ত মানবমুখের অনবরত ঘুরতে থাকা। সঙ্গে আছে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ এবং এখানেও এক আবদ্ধতার অনুভূতি তৈরি হয় যা দর্শককে মানসিক অস্বস্তি দেয়। সর্বশেষ রুমটিতে রয়েছে প্রকৃতির সেই ক্যালাইডোস্কোপিক স্থিরচিত্র। তবে এখানে আমরা প্রথমবারের মতো শিল্পীর আত্মপ্রতিকৃতি দেখতে পাব। তবে সেই আত্মপ্রতিকৃতির উপস্থাপনা কোনো স্বাভাবিক ঢঙে নয় বরং কিছুটা হ্যালুসিনেটিক স্টাইলে। প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এখানে শিল্পীর ওই আত্মপ্রতিকৃতি ছাড়া আর কোথাও কোনো শিল্পকর্মে সরাসরি কোনো রূপকের (মেটাফোর) সন্ধান পাওয়া যায় না বরং উপস্থাপিত শিল্পকর্মগুলো অনেক বেশিই মেটোনিমিক। এমনকি কোনো শিল্পকর্মের শিরোনাম নেই। ফলে এককভাবে শিল্পকর্মগুলো পাঠ করার সুযোগও রাখেননি শিল্পী তানভীর পারভেজ। বরং সম্পূর্ণ প্রদর্শনীই একটা শিল্পকর্ম।
তিন.
প্রদর্শনীটি ডিজিটাল মাধ্যমে করা যা আমাদের বর্তমান বাস্তবতাকে সুনির্দিষ্টভাবে ইঙ্গিত করে। ডিজিটাল যুগের বাস্তবতায় আমরা প্রায়ই তথ্যকে নিরপেক্ষ সত্য মনে করি। ফলে তথ্য আর অনুভূতির সীমা অস্পষ্ট হয়ে যায় এবং আমাদের নিজস্ব স্মৃতির সঙ্গে তথ্য মিশে যায় যা আমাদের আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলিত সত্য হিসেবে সামনে আসে। যেহেতু আকাঙ্ক্ষা মানব অস্তিত্বের অন্যতম মৌলিক চালিকাশক্তি। সুতরাং মানুষ কেন কিছু চায়, কেন অসম্পূর্ণতা অনুভব করে এবং কেন ক্রমাগত কোনো ‘অন্য’ অবস্থার দিকে অগ্রসর হতে চায়—এ প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।
এমনকি সেই সুদূর প্রাচীনকাল থেকে ‘আকাঙ্ক্ষা’কে কেন্দ্র করেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনে গভীর চিন্তা গড়ে উঠেছে। তবে দুই ধারার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য লক্ষ করা যায়।
প্রাচ্য দর্শনে আকাঙ্ক্ষা সাধারণত দুঃখ ও বন্ধনের উৎস হিসেবে বিবেচিত। বৌদ্ধ দর্শনে বলা হয়, তৃষ্ণা বা কামনাই দুঃখের মূল কারণ; মানুষ বস্তু, সম্পর্ক বা পরিচয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে স্থায়িত্ব খোঁজে, অথচ বিশ্ব অনিত্য। ফলে আকাঙ্ক্ষা যত বাড়ে, অস্থিরতাও তত বাড়ে। মুক্তি আসে আকাঙ্ক্ষাকে দমন নয়, বরং তাকে বোঝা ও অতিক্রম করার মাধ্যমে। একইভাবে উপনিষদীয় ও যোগদর্শনে আকাঙ্ক্ষাকে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ ভুলে যাওয়ার ফল হিসেবে দেখা হয়—যেখানে বাহ্যিক চাওয়ার পরিবর্তে অন্তর্মুখী জ্ঞানই পরম শান্তির পথ।
সুফি চিন্তায় আকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণ নাকচ করা হয় না; বরং তাকে রূপান্তরিত করা হয়। পার্থিব ইচ্ছা ধীরে ধীরে ঈশ্বরের প্রতি প্রেমে পরিণত হয়। এখানে আকাঙ্ক্ষা একধরনের আধ্যাত্মিক শক্তি, যা মানুষকে সীমিত সত্তা থেকে অসীমের দিকে টেনে নেয়।
অন্যদিকে পাশ্চাত্য দর্শনে আকাঙ্ক্ষা প্রায়ই সৃজনশীল ও অস্তিত্বগত শক্তি হিসেবে উপস্থিত। প্লেটোর চিন্তায় প্রেম ও আকাঙ্ক্ষা মানুষকে সৌন্দর্যের উচ্চতর উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। আধুনিক যুগে ফ্রয়েড আকাঙ্ক্ষাকে মানবমনস্তত্ত্বের মৌলিক চালিকা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, আর নিটশে এটিকে জীবনীশক্তির প্রকাশ হিসেবে দেখেন। এটি একধরনের ‘ইচ্ছাশক্তি’ যা ব্যক্তি মানুষকে তার নিজেকে অতিক্রম করতে প্ররোচিত করে।
প্রাচ্য দর্শন আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্তির পথ খোঁজে, আর পাশ্চাত্য দর্শন আকাঙ্ক্ষাকে রূপান্তর ও সৃষ্টির শক্তি হিসেবে বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু গভীরে উভয় ধারাই সম্ভবত এক জায়গায় মিলিত হয়: আকাঙ্ক্ষা কেবল অভাবের লক্ষণ নয়; এটি মানুষের অর্থ, পরিচয় ও পরম অনুসন্ধানের ভাষাও। ফলে শিল্পী তানভীর পারভেজের ‘উপাত্ত, আকাঙ্ক্ষা ও পরম’ প্রদর্শনীতে দর্শক হিসেবে আমাদের যে সংযোগ তা আমাদের জীবনের অর্থ, পরিচয় ও পরম বা চূড়ান্তকে অনুসন্ধানের যে আকাঙ্ক্ষা তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
‘উপাত্ত, আকাঙ্ক্ষা ও পরম’ প্রদর্শনীতে শিল্পী তানভীর পারভেজের বিশেষত্ব হলো তিনি শিল্পকে একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন। যেটা তার পূর্ববর্তী প্রদর্শনীতেও আমরা দেখতে পেয়েছি। তিনি বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে পশ্চিমা ইমার্সিভ আর্টের যে ম্যাজিক্যাল মোমেন্ট বা আবহ তৈরির যে ধাঁচ, সেই ধাঁচে তার কাজগুলো করেননি। বরং এমন একটা পরিবেশের মধ্যে দর্শকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যে একজন দর্শক শিল্পের আয়নায় সচেতন কিংবা অবচেতনভাবে নিজেকেই খুঁজতে চাইবেন। এমনকি এটা বলা অত্যুক্তি নয় যে শিল্পী তার আত্মপ্রতিকৃতির মতো দর্শকদের হ্যালুসিনেশনের জগতে প্রবেশ করিয়ে এ বৈশ্বিক আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে তার নিজস্ব অবস্থান অনুসন্ধানের দিকে প্ররোচিত করছেন।
মো. বজলুর রশিদ শাওন
ভিজ্যুয়াল প্রফেশনাল