নাসির আলী মামুনের আলোর ক্যানভাসে ‘শতবর্ষে সুলতান’

‘...কেউ কি বলে, বিলেত ফেরত সুলতান? আমেরিকা ফেরত সুলতান? আমি নড়াইলের সুলতান।

‘...কেউ কি বলে, বিলেত ফেরত সুলতান? আমেরিকা ফেরত সুলতান? আমি নড়াইলের সুলতান। মাছিমদিয়া-কুড়িগ্রামের সুলতান। আমার ছবিতে শুধুই গ্রাম। বাংলাদেশই তাই। বাঙালি চরিত্রই গ্রাম থেকে উঠে আসা। আমার চোখে দালান-কোঠা-গাড়ি, যন্ত্রপাতি, কারখানা ওসব ধরা পড়ে না। আমি শুধু মানুষ দেখি। গ্রামের মানুষ, এরাই বাংলার ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে, বাঙালিয়ানাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।’

এসএম সুলতানকে কেন্দ্রে রেখে হাসনাত আবদুল হাই লিখেছেন ‘সুলতান’ উপন্যাস। সেখানে এভাবেই কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ভাষ্যে উঠে এসেছে তার চরিত্রের স্বরূপ। কেবল হাসনাত আবদুল হাই নন, যুগে যুগে সুলতানকে নিয়ে লেখা হয়েছে নানা গল্প, উপন্যাস। কোনোটায় তার জীবনী তুলে ধরা হয়েছে, কোনোটায় জীবনের খণ্ডবিশেষ, কখনো ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ। সেগুলো পড়ে অনুমান করে নিতে হয় সুলতানের রঙ, তুলি, ক্যানভাস, জীবনযাপন, সংগ্রাম ও স্বপ্ন। কিন্তু সুলতান এবং তার জগৎ আসলে কেমন ছিল? এসবের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি কি নেই? উত্তর হলো, আছে।

সুলতান রঙ-বেরঙের দৃশ্য সাদা ক্যানভাসে এঁকেছেন। আর তাকে ধরে রেখেছেন নাসির আলী মামুন। সুলতানের মুখের আদল, মেঝেতে বসে আঁকা শিল্পকর্ম, নিরবচ্ছিন্ন ধ্যানমগ্নতা আলো দিয়ে এঁকেছেন খ্যাতনামা এ আলোকচিত্রশিল্পী। সুলতানের জগৎকে অনুমান নয়, অনুভব করতে হলে আশ্রয় নেয়া যায় নাসির আলী মামুনের প্রতিকৃতি-আলোকচিত্রে। নদীর লহর বয়ে যাওয়ার মতো দেখতে একমাথা চুল নিয়ে বসে আছেন সুলতান। কালো আলখাল্লায় আবৃত করে রেখেছেন নিজেকে। অভিজ্ঞতার ভাঁজ কপালে। শূন্যে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু দৃষ্টি দৃঢ়। শূন্যে তাকিয়ে হয়তো তিনি ভাবছিলেন এ দেশ আরো একবার কৃষকের হবে। কৃষক তার হারানো স্বাস্থ্য ফিরে পাবেন। নাসির আলী মামুনের তোলা এমন সব জীবন্ত আলোকচিত্র নিয়েই সাজানো হয়েছে ‘শতবর্ষে সুলতান’ প্রদর্শনী। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ ও এইচএসবিসি বাংলাদেশের সহযোগিতায় বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত এ প্রদর্শনী চলবে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ১০৮টি আলোকচিত্র দিয়ে এ প্রদর্শনী সাজানো হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ স্থিরচিত্রই সাদাকালো। তবে আলো-আঁধারের এমন মিশেলে ধারণ করা হয়েছে প্রতিটি দৃশ্য, যেন জীবনানন্দ দাশের মতো আলোকচিত্রশিল্পী নীরবে জানান দিলেন, ‘আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার’।

নাসির আলী মামুন সুলতানের জীবনের ক্যানভাসের বিভিন্ন দৃশ্য নানা সময়ে ফ্রেমবন্দি করেছেন। এ প্রদর্শনীর ছবিগুলো কেবল একজন চিত্রশিল্পীর প্রতিকৃতি নয়, বরং তৎকালীন সময় ও চিত্রশিল্পের ধারার দালিলিক প্রমাণ। সেই সঙ্গে এ প্রদর্শনী আধুনিক দৃশ্যশিল্পের ইতিহাসেরও ধারক। জানা যায়, ১৯৭৭ সালে সুলতানের সঙ্গে পরিচয় হয় আলোকচিত্রশিল্পী মামুনের। সময়ের পরিক্রমায় সে পরিচয় সখ্যে রূপ নেয়। সুলতানের বৈচিত্র্যময়, বোহেমিয়ান জীবন আকৃষ্ট করে মামুনকে। ১৯৭৯ সালে মামুন পাড়ি জমিয়েছিলেন সুলতানের জানালা-দরজাবিহীন মাছিমদিয়া আবাসস্থানে। সেখানে গিয়ে একাগ্রচিত্তে ধারণ করেছেন সুলতানের জীবনঘনিষ্ঠ শতাধিক স্থিরচিত্র। মূলত তিনি ক্যামেরার লেন্সে ভিন্নভাবে আবিষ্কার করেছেন সুলতানকে, যার ছাপ তার আলোকচিত্রে স্পষ্ট।

সুলতান মেঝেতে খেতে বসেছেন। জানালা দিয়ে আলো চুইয়ে পড়ছে। সামনে চারটা বিড়াল। সুলতান চেয়ে আছেন তাদের দিকে। সুলতানের পরম সঙ্গী ছিল বিড়ালগুলো। তিনি নিজে যা খেতেন, তাদেরও খাওয়াতেন। দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় সেই ছবির দিকে। আরেকটি ছবিতে সুলতান নীরব বাক্যবিনিময় করছেন টিয়া পাখির সঙ্গে। ভিন্ন এক ছবিতে চাদরের ভেতর দুই বিড়ালকে জড়িয়ে রেখেছেন। সুলতানের সাহচর্য যেন তাদের চোখেমুখেও ভাষা এনে দিয়েছে। এসব ছবি দেখে মনে হয়, পশু-প্রাণীকে খাওয়ানো, যত্ন করা ছিল সুলতানের উপাসনার একটি ধরন। এভাবে তিনি সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য পেয়েছেন। কেননা সুলতান বলতেন, ‘গাছের মূলে পানি দেওয়া এটাও উপাসনা হতে পারে। সবসময় আনুষ্ঠানিকতাকে বড় করে দেখলে চলে না। ভালো সংগীত, ছবি, আবেগ, উচ্ছ্বাস, ভালোবাসা, সততা—এই সবই সৃষ্টিকর্তাকে এনে দেয়।’

গভীর মনোযোগ ও একনিষ্ঠ নিবেদন ছাড়া সুলতানের মতো একজন মুক্তমনা, প্রথাবিরোধী, শিল্পসচেতন মানুষকে এভাবে ফ্রেমবন্দি করা সম্ভব নয়, সেটিও বোঝা যায়। ফলে দর্শকের সামনে জন্মশতবর্ষে যেন হাজির হয়েছেন একজন ভিন্ন সুলতান, কখনো হাতে রঙ-তুলি, কখনো বাঁশি, কখনো বা কুকুর-বেড়াল। এমনকি সাপও ধরতেন তিনি। বিষধর সাপও তার বশীভূত হওয়ার কথা শোনা যায়। মাছিমদিয়ার পরিত্যক্ত জমিদারবাড়িতে সুলতান কেবল বাস করতেন তা নয়। সেখানে তিনি শিশুদের ছবি আঁকা শেখানো, শিক্ষা দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টাও করে গেছেন মৃত্যু পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘শিশুস্বর্গ’। শিশুস্বর্গের শিশুদের সঙ্গেও রয়েছে তার ছবি। আবার কখনো স্রেফ তুলি হাতে চেয়ারে বসে আছেন, সেই ছবিও সাজানো হয়েছে বেঙ্গল শিল্পালয়ের দেয়ালে। তবে প্রদর্শনীতে এসব স্থিরচিত্রের বাইরেও আছে সুলতানকে নিয়ে লেখা নাসির আলী মামুনের বই, সুলতানের লেখা চিঠি, তার আঁকা ছবিসহ বিভিন্ন স্মারকসামগ্রী। প্রদর্শনীর ঘরের এক কোণে আলোর ওপরে বিছিয়ে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন ছবির ‘নেগেটিভ’। সব মিলিয়ে ভিন্ন সুলতানকে যেমন ফ্রেমবন্দি করেছেন নাসির আলী মামুন, তেমনি স্মৃতির আর্কাইভও হয়ে উঠেছে প্রদর্শনীটি।

আরও