২৩ জুন ২০২৬ সাল, পলাশী বিপর্যয়ের ২৬৯তম বার্ষিকী। ১৭৫৭ সালের পলাশী এক মহাবিপর্যরের নাম! সে বিপর্যয় বাংলা তথা ভারতবর্ষের। তৎপরবর্তী এক করপোরেট দানবের নাম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যার সূত্র ধরে উপনিবেশের বিশ্বময় বিস্তারের পথরেখা আঁকা হয়েছিল। অঞ্চলে অঞ্চলে, দেশে দেশে দুনিয়াজুড়ে শাসন শোষণের জাতাকলে উপনিবেশের মানুষ হয়েছে প্রতারিত, বঞ্চিত, নিগৃহীত। ক্ষুধা-মন্দায় কেটেছে তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কোম্পানি থেকে ব্রিটিশ দখল ব্যবস্থায় ঢুকে নিজ নিজ দেশে থেকেও দেশহারা মানবসন্তানকুল অপদস্তের জীবন চূড়ান্ত কায়ক্লেশে পার করেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী! হ্যাঁ, ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলা তথা ভারতের সম্মান হারানো, স্বাধীনতাহারা মানুষ এক মরণপণ লড়াই করে বেঁচে থেকেছে। হত্যা, লুট, অনাহারে অভুক্ততায় মৃত্যুর বিভীষিকা একের পর এক মোকাবেলা করেছে এ অঞ্চলের মানুষ; উপনিবেশায়িত মানুষ। কিন্তু সেসবকে আড়াল করতে মিথ্যার নানাবিধ অচলায়তনের ব্যবহার করেছে ঔপনিবেশিক দখলদারেরা। লিখিত ও চিত্রিত তাদের শাসনের ইতিহাস লক্ষ করলে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালে পলাশী বিপর্যয়ের ২৬৯তম বার্ষিকী। এ সময়ে দাঁড়িয়ে ১৭৫৭ সালের পরবর্তী পরিক্রমা ইতিহাসের নানা অলিগলিতে বিস্তৃত হয়েছে যে পাঠ তার ‘নান্দনিক দুনিয়াটা’ কেমন? কেমন করে তার ‘নন্দনপাঠ’ তারা দুনিয়ার সামনে হাজির করেছিল? বলা বাহুল্য, নানা কায়দায় উপস্থাপিত, পরিবেশিত সেসব ‘নন্দন বিচার’ নেহাত নিরীহ চিত্রকর্ম হিসেবে নির্মিত হয়নি, হয়েছিল প্রোপাগান্ডার নির্বিচার ‘প্রতারণার কৌশলী চিত্র’ হিসেবে।
পলাশীর ২১ বছর পর স্পিরিদিওনে রোমার অঙ্কিত ফরমায়েশি চিত্রকর্মই এর প্রথম উদাহরণ। ফলে এ চিত্র নির্মাণের অভিলিপ্সা ছিল মূলত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলদারি শাসনের পক্ষে সম্মতি উৎপাদনের বয়ান, যা ব্রিটিশ সমাজ যথার্থই ‘মগজধারণ’ করেছিল বৈকি। শুধু তা-ই নয়, পরবর্তী সময়ে উপর্যুপরি এমন বয়ান প্রোপাগান্ডামূলক চিত্র নির্মাণশৈলীর অব্যাহত চর্চা লক্ষ করা যায়। এ নিবন্ধে সেসবেরই কিছু কথা সমাচার লিপিবদ্ধ করার প্রয়াস।
লন্ডনের লেডেনহল স্ট্রিটে অবস্থিত ইস্ট ইন্ডিয়া হাউজের রেভিনিউ কমিটি রুমের জন্য আঁকা এ চিত্রকর্ম মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকের লন্ডনের জনপরিসর ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে নিজেদের একটি ভাবমূর্তি তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা থেকে স্থাপন করা হয়েছিল। রোমার চিত্রকর্মটি ইতিহাস লিখন পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত: এটি কোম্পানির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের মুহূর্তে নির্মিত হয়েছিল; যখন কোম্পানিটি মূলত একটি সামুদ্রিক বাণিজ্য সংস্থা থেকে উত্তর-পূর্ব, মধ্য ও দক্ষিণ ভারতের দ্রুত সম্প্রসারণশীল অঞ্চলগুলোর ওপর এক ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক ও প্রশাসনিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছিল। মাইকেল রাইসব্র্যাকের মার্বেলের চিমনি-পিস ও পাশাপাশি তৈরি করা হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া হাউজের আদালত কক্ষের একটি আলংকারিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের দ্রুত সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের বস্তুগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর রূপক সম্পর্কটি সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ও শক্তিশালীভাবে উপস্থাপনের প্রয়াস ছিল। ১৭৬০ ও ১৭৭০-এর দশকে ঘটে যাওয়া একাধিক বড় কেলেঙ্কারির মধ্যে, ক্লাইভের ব্যক্তিগত পারিশ্রমিকের বিষয় ছাড়াও ছিল বাংলার দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা, আর্কটের নবাবের সঙ্গে কোম্পানির সন্দেহজনক লেনদেন ও গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অভিযোগ, যার মধ্যে এডমন্ড বার্কের অভিযোগ ছিল সবচেয়ে জোরালো। এ পরিস্থিতিতে রোমার চিত্রকর্মটি বিরূপ প্রচারের মহানগরীয় সমালোচনা থেকে দৃষ্টি ফেরাতে ব্যবহৃত হয়েছিল।
১৭৭৮ সালে লন্ডনে অভিবাসী অখ্যাত ইতালিয়ান শিল্পী রোমার হাতে চিত্র আঁকা হচ্ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সদর দপ্তরে। অথচ তার বছর ১০ আগেই লন্ডনের শিল্পী টিলি কেটল ঔপনিবেশিক ভারতে কর্মরত প্রথম ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী হিসেবে নাম লিখিয়েছেন। তখন তার বয়স ৩৩ বছর। ১৭৭২-৭৬ সালের মধ্যে আঁকা নবাব মোহাম্মদ আলী খানের প্রতিকৃতি ছিল তার প্রথম শিল্পকর্ম। উল্লেখ্য, টিলি কেটল বাংলা বিহার উড়িষ্যায় ঘটে যাওয়া ছিয়াত্তরের কথিত মন্বন্তর বা হত্যাকাণ্ডের বছর দুই আগে থেকেই ভারতে বসবাস করছিলেন। ১৭৭০ সালে খাদ্যাভাবে এক কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। টিলি কেটলসহ অনেক শিল্পীই ভারতীয় প্রকৃতি ও অভিজাত সমাজের প্রতিনিধিদের প্রতিকৃতি আঁকতে ব্রতী হয়েছিলেন। এসব বিলাতি শিল্পীমন পরপর ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষ মন্বন্তরের কোনো ছবিই আঁকেননি! কিন্তু কেন? এবার সেসব বিষয়ে আলোকপাত করা যাক।
এ আলোচনা ব্রিটিশ শিল্পীদের দৃষ্টিকোণ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারতের দৃশ্য শিল্পের ইতিহাস নির্মাণ প্রকল্প পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার চেষ্টা! প্রশ্ন হতে পারে, ব্রিটিশ শিল্পীরা কীভাবে তখন কোম্পানির ভারত বিজয় ও তাদের কর্মকাণ্ডে সাহায্য করেছিলেন? আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন, বাণিজ্য, রাষ্ট্রনীতি ও শিল্পের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ম্যাকিয়াভেলি, তাঁর Discourses on Livy গ্রন্থে ডিপ ফেকের মতো ঘটনার জনপ্রিয়তার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘সাধারণ মানুষ যা দেখে তাই সত্যি বলে মেনে নেয়; এমনকি তারা প্রায়ই বাস্তবতার চেয়ে বাহ্যিক রূপ দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়।’ এমন এক যুগে যেখানে ‘যা দৃষ্ট হয়’ এবং ‘যা আসলেই সত্যি’র মধ্যকার সীমারেখা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছে, সেখানে দৃশ্যমান তথ্যের আড়ালে থাকা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অনুধাবন করার ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শিল্পকলার ইতিহাস ও সাম্রাজ্যের প্রতারণা, রক্তপাত ও কূটনীতির গল্পে পরিপূর্ণ, যা সেসব চিত্রকর্মের মধ্যে এ ধরনের রাজনৈতিক অভিসন্ধি দেখায় আমাদের চোখকে প্রশিক্ষিত করতে পারে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারত সম্পর্কে ব্রিটিশদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মিশ্র; কিছু ছিল নিন্দাসূচক, কিছু আবার ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ এবং ব্রিটিশ শিল্পীরাও তাদের চিত্রাঙ্কনে আশ্চর্যজনকভাবে একই রকম ছিলেন বলে মনে হয়। ভারতীয়দের মুখাবয়বে বিস্তারিত বিচিত্র লক্ষণের যেমন অভাব রয়েছে এবং বেশির ভাগকেই গতানুগতিক কৃষ্ণকায় হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। ঐতিহাসিক ‘পিকচারিং ইন্ডিয়া’ (নিয়োগী বুকস) পুস্তকে শিল্পী ও পর্যটক উইলিয়াম হজেস, জ্যান ভ্যান রাইন ও টমাস ড্যানিয়েলের চিত্রকর্মের মাধ্যমে ভারত সম্পর্কে ব্রিটিশ দৃষ্টিভঙ্গিকে জীবন্ত করে তুলেছে।
চিত্রকর টিলি কেটলের আঁকা প্রথম চিত্রটি নবাবের পক্ষ থেকে গভর্নর Charles Bourchier-এর জন্য একটি বিদায়ী উপহার হিসেবে আঁকা হয়েছিল, যিনি ১৭৭০ সালের জানুয়ারিতে মাদ্রাজ থেকে অবসর গ্রহণ করতে যাচ্ছিলেন। বুরশিয়ার ছবিটি লন্ডনে নিয়ে যান এবং পরের বছর এটি সোসাইটি অব আর্টিস্টসে প্রদর্শিত হয়। ক্যাটালগে এর শিরোনাম হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল ‘মহম্মদ আলী কন (আর্কটের নবাব এবং কর্ণাটিকের সুবাহ, ইংরেজদের বিশ্বস্ত বন্ধু) এবং তার পাঁচ পুত্রের প্রতিকৃতি. কেটলের আঁকা আরেকটি ছবি, যেখানে একটি প্রাকৃতিক দৃশ্যের মাঝে হিন্দু সতীদাহের দৃশ্য চিত্রিত হয়েছে, তা এক নতুন ধরনের প্রাচ্য ঘরানার বয়ান তৈরি করে, যা শহুরে রোমান্টিকতার প্রলেপে গ্রামীণ আবহ ধারণ করে। ১৭৭৬ সালে সোসাইটি অব আর্টিস্টসের যে প্রদর্শনী ক্যাটালগে একটি ব্যাখ্যাসহ শিরোনাম দেয়া হয়েছিল: ‘একজন হিন্দু মহিলার তার মৃত স্বামীর শবদাহের চিতায় আরোহণের পূর্বে আত্মীয়দের কাছ থেকে বিদায় গ্রহণ এবং তার গহনা বিতরণের অনুষ্ঠান’। বিদেশীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এ ঘটনার বাস্তবতা চিত্রিত করার পরিবর্তে কেটল দৃশ্যটিকে আদর্শায়িত ও মহিমান্বিত করেছিলেন। তিনি এঁকেছেন, মার্জিত তরুণী বিধবাটি শান্তভাবে তার পায়ে লুটিয়ে পড়া ব্রাহ্মণদের অভিবাদন জানাচ্ছেন, আর পরিবারের সদস্যরা সহানুভূতির সঙ্গে তা দেখছেন। সম্ভবত এই প্রথমবার সতীদাহের দৃশ্যের কোনো চিত্রকর্ম জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হয়েছিল এবং যেহেতু ভারতে আসা ইউরোপীয় পর্যটকেরা এ প্রাচীন প্রথা নিয়ে ব্যাপকভাবে লিখেছিলেন, তাই কেটলের ছবিটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ শিল্পীদের আঁকা এমন কোনো তৈলচিত্র বা চারুকলার সন্ধান পাওয়া যায় না, যেখানে ১৭৭০ সালের মহাবঙ্গ দুর্ভিক্ষের মতো তৎকালীন বিধ্বংসী ভারতীয় দুর্ভিক্ষগুলোকে স্পষ্টভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। সে সময়ের ব্রিটিশ শিল্পকর্ম মূলত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত হতো এবং এতে রোমান্টিক ভূদৃশ্য (যেমন, উইলিয়াম হজেস ও ড্যানিয়েলস) ও কূটনৈতিক প্রতিকৃতির ওপর মনোযোগ দেয়া হতো।
শিল্প ইতিহাসবিদরা এ ধরনের প্রতিকৃতিকে (টিলি কেটলের আঁকা সুজা-উদ-দৌলা, অযোধ্যার নবাব) সুস্পষ্ট কারণেই ‘দম্ভপূর্ণ প্রতিকৃতি’ বলে অভিহিত করেন: সুজা ক্যানভাসের মাঝখানে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে তাঁর ধনুক, এবং তার পেছনে রয়েছে তার রাজ্য, অনুচর ও সশস্ত্র সৈন্যদল। তবে এর সৌন্দর্য ও দম্ভের বাইরেও এ প্রতিকৃতি ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে ভারতের সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি উন্মোচন করে। আমরা আজ এটিকে ভূ-রাজনীতি ও সফট পাওয়ারের পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারি। শিল্পী টিলি কেটল এ শিল্পকর্ম এঁকেছিলেন ব্রিটিশদের একটি ঔপনিবেশিক কৌশলের অংশ হিসেবে, যার উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ শিল্পের মাধ্যমে কূটনীতির একটি নতুন ভাষা তৈরি করা এবং এর মাধ্যমে এমন কিছু ছড়িয়ে দেয়া, যাকে আমরা হয়তো কালানুক্রমিকভাবে ‘সফট পাওয়ার’ বলতে পারি। শিল্প ইতিহাসবিদ নাতাশা ইটন দেখিয়েছেন যে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্রিটিশরা তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের সুবিধার্থে কেটলের মতো প্রতিকৃতিশিল্পীদের উপমহাদেশে পাঠিয়েছিল। ভারতে ব্রিটিশদের ইতিহাসের এ সময় পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মূলত একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছিল। রিচার্ড বার্নেট তার ‘নর্থ ইন্ডিয়া বিটুইন এম্পায়ার্স’ গ্রন্থে যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, কোম্পানি প্রথমে মোগল সাম্রাজ্যের ভূখণ্ড এবং এর আঞ্চলিক শাসক নবাবদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে ‘মুক্ত বাণিজ্য’—অর্থাৎ ব্রিটেন ও কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের জন্য একটি অনুকূল বাণিজ্য ভারসাম্য চেয়েছিল। কিন্তু শিগগিরই, ভূখণ্ড সম্প্রসারণ এবং ঔপনিবেশিক শাসন কোম্পানির কাজের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। একটি বাণিজ্য সংস্থা থেকে রাষ্ট্রসদৃশ সত্তায় এ রূপান্তরের পেছনের চুক্তিগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য, কোম্পানি কেটলের মতো শিল্পীদের নবাবদের কাছে প্রতিকৃতি কূটনীতিচর্চার জন্য পাঠিয়েছিল।
১৭৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে টিলি কেটল যখন নবাবের মুক্তা ও হীরার আধিক্যে আবৃত সেই জাঁকজমকপূর্ণ প্রতিকৃতিটি আঁকেন, যার তাৎপর্য ছিল নিছক আর্থিক মূল্য হিসেবেই ব্যক্তিটিকে মূর্ত করে তোলা; যেন প্রতিকৃতিটি একধরনের আর্থিক বন্ধক হিসেবে জাহির করছিল, যা তার সত্তাকে কোম্পানির কাছে বন্ধক রাখা এবং কোম্পানির হাতের পুতুল হিসেবে দৃশ্যমান করে তুলেছিল। কোম্পানির কাছে তিনি ছিলেন তখন পর্যন্ত সক্ষম এক জীবন্ত ব্যাংকনোট। কেটলের কাছে এ কাজ অবশ্যই মূল্যবান ছিল, কেননা ওয়ারেন হেস্টিংস তাকে এ প্রতিকৃতির জন্য ১ হাজার গিনি পারিশ্রমিক দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, নবাব ইংল্যান্ডে তার স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য কোম্পানির বিভিন্ন কর্মকর্তাদেরও অর্থ প্রদান করতেন, ফলে ১৭৬৩ থেকে ১৭৯২ সালের মধ্যে, ‘প্রকৃতপক্ষে নবাবির টাকায় কেনা আসনে অন্তত এক ডজন ইংরেজ লন্ডনের সংসদে বসতেন’ (Dirks তাঁর Scandal of Empire গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন)।
বেঞ্জামিন ওয়েস্টের আঁকা একটি বিখ্যাত চিত্রকর্মের কথা বলা যাক, যেখানে মোগল সম্রাট শাহ আলম রবার্ট ক্লাইভ ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে বাংলায় কর আহরণের ফরমান হস্তান্তর করছেন (১৭৬৫)। ১০০ বছরেরও কিছু বেশি সময় আগে আওরঙ্গজেব প্রায় ব্রিটিশদের বিতাড়িত করেছিলেন, কিন্তু ১৭৬০-এর দশকে উদ্যমী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্যকে ডুবিয়ে দিয়ে উপমহাদেশে দখলদার শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল। চিত্রকর্মটি পর্যবেক্ষণ করলে দৃষ্টিগোচর হয় যে কীভাবে ব্রিটিশ ও তাদের মিত্রদের আলোকিত চরিত্র হিসেবে, আর বেশির ভাগ ভারতীয়কেই ছায়াচ্ছন্ন আঁধারিমার উপস্থাপন করা হয়েছে।
ইউরোপ ও ভারতে রাষ্ট্রনীতিতে প্রতিকৃতির মাধ্যমে কূটনীতি দীর্ঘকাল ধরেই একটি প্রধান উপাদান ছিল। এমন এক সময় ছিল যখন অন্য রাজার রাজ্যে ভ্রমণ প্রাণঘাতী হতে পারত, তখন শাসকেরা সংবেদনশীল আলোচনার অংশ হিসেবে নিজেদের পরিবর্তে প্রতিকৃতি পাঠাতেন। শাসকেরা প্রতিকৃতির সঙ্গে এমনভাবে রীতি মেনে চলতেন, যেন সেগুলো কোনো ব্যক্তির প্রতিরূপ নয়, বরং সেই ব্যক্তিরই প্রতিমূর্তি। কথিত আছে, রানী প্রথম মেরি যখন তার স্বামীর ওপর ক্রুদ্ধ হতেন, তখন তিনি তার শয়নকক্ষ থেকে স্বামীর প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলার আদেশ দিয়েছিলেন এবং অন্যান্য রাজা-রানীরাও কূটনৈতিক ছবির প্রতি অভিবাদন জানাতেন, মাথা নত করতেন, এমনকি সেগুলোর সঙ্গে কথাও বলতেন। ভারতেও প্রতিকৃতি রাষ্ট্রের ইচ্ছার প্রকাশ ঘটাত।
বাংলার ওপর কোম্পানি করপোরেটের ছায়া
বিদ্রূপের বিষয় হলেও শিল্পী ওয়েস্ট তার চিত্রকর্মে ভারতীয়দের ছায়াচ্ছন্ন করে এঁকে ভুল করেছিলেন? আসলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে দিওয়ানি তুলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলার ওপর এক ভয়াবহ কর্তৃত্বের প্রয়োগ শুরু হয়েছিল। পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যেই কোম্পানির শোষণমূলক ব্যবসায়িক কার্যকলাপ স্থানীয় অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয় এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয় একের পর এক দুর্যোগ, যা ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কারণ হয়েছিল। এ সময়ে এক কোটি মানুষ মারা যায়, যা ছিল প্রদেশটির মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ।
আমরা সহজেই ধারণা করতে পারি যে কভিড যেখানে প্রায় তিন বছরে বিশ্বব্যাপী ৬৫ লাখের কাছাকাছি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে, সেখানে দুর্ভিক্ষে শুধু একটি প্রদেশেই এক কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। সে প্রদেশটি আজকের পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, ওড়িশা ও বিহারের কিছু অংশজুড়ে বিস্তৃত। পুরো প্রজন্ম কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন কৃতিত্বের কথা বলতে গেলে বিশ্বকে এ হত্যাযজ্ঞের বিষয়টি লক্ষ রাখতেই হবে। জানি না এ দুর্ভিক্ষের বর্ণনা নিজ দেশে থাকা ইংরেজদের হতবাক করেছিল কি না, তবে যখন তারা দেখল কোম্পানির কর্মকর্তারা কোটিপতি হয়ে দেশে ফিরছেন, তখন তারা বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছিল হয়তো (আমার সন্দেহ, এ ক্ষোভ নৈতিক সততার চেয়ে ঈর্ষা থেকেই বেশি উদ্ভূত হয়েছিল)। ওয়েস্টের চিত্রকর্মের কেন্দ্রীয় চরিত্র রবার্ট ক্লাইভ (শাহ আলমের কাছ থেকে ফরমান গ্রহণরত), যাকে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কথিত আছে, ক্লাইভ নগদ অর্থ ও গহনা মিলিয়ে ১২ লাখ পাউন্ড সঙ্গে নিয়ে ভারতে ফিরে এসেছিলেন। আজকের মূল্যে এর পরিমাণ ২৮ কোটি ৬৪ লাখ পাউন্ড (২৮৬ মিলিয়ন পাউন্ড)। এটি ছিল একজন ব্যক্তির উপার্জন না লুট? এমন আরো অনেক কোম্পানি কর্মচারী কোটিপতি ছিল, যারা ভারত থেকে লুট করে তাদের কোটি কোটি টাকা ও সমমানের রত্নসামগ্রী বিলাতে পাচার করেছিল।
রোমার আঁকা চিত্রটি ভারতে কোম্পানির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকে এমনভাবে চিত্রিত করে যে বহিরাগত ও আকর্ষণীয় তরুণী ভারত এক বৃহৎ থালায় করে আপাতদৃষ্টিতে সীমাহীন বস্তুগত সম্পদ তুলে দিচ্ছে উচ্চ ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্বকে এবং যিনি তার সামনে উপচে পড়া রত্ন প্রাচুর্য থেকে নিজের জন্য এক জমকালো মুক্তার মালা তুলে নিচ্ছেন। যার সাদৃশ্য চিত্রকর কেটলের আঁকা আর্কটের নবাবের আকর্ষণীয় প্রতিকৃতির মনি-মুক্তার মালার মতোই। কলকাতা তার ‘মুক্তা ও অন্যান্য মূল্যবান রত্নের’ ঝুড়ি নিয়ে পথ দেখাচ্ছে, তার পেছনে চীন, ‘চীনামাটির পাত্র ও চায়ের বাক্স’ নিয়ে; মাদ্রাজ ও বোম্বে, ‘দড়ির গাঁট’ দ্বারা প্রতীকায়িত; বাংলা, ‘একটি হাতি, তালগাছ ও উট’ দ্বারা পরিচয় নির্দেশিত; এবং সবার পেছনে পারস্য, ‘রেশম, ওষুধপত্র এবং অন্যান্য সামগ্রী’ নিয়ে আসছে। পরিশেষে, দূরে কোম্পানির জাহাজটি ‘প্রাচ্যের সম্পদে বোঝাই, যা সেই বাণিজ্যের প্রতীক যেখান থেকে ব্রিটেন ও কোম্পানি উভয়ই আর্থিক সুবিধা লাভ করছে’।
সুজা-উদ-দৌলার প্রতিকৃতির লক্ষণের মধ্যেই হয়তো ভারতীয় উপমহাদেশে কোম্পানির রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য ব্রিটিশদের অনুকূলে এবং ভারতের বিশাল অংশের ওপর তাদের চূড়ান্ত রাজত্বের বীজ বপন করার খায়েশ লুকিয়ে থাকবে। ব্রিটিশ ও সুজার এক সাধারণ শত্রু ছিল পশ্চিমে অবস্থিত রোহিলা আফগানরা। ব্রিটিশরা রোহিলাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে নিজেদের ও মারাঠাদের মধ্যে একটি বৃহত্তর মধ্যবর্তী রাজ্য তৈরি করতে চেয়েছিল; মারাঠারা ছিল আরেক শক্তিশালী ভারতীয় যোদ্ধা গোষ্ঠী, যারা ব্রিটিশদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি ছিল। তাই সুজা যখন রোহিলাদের ভূমি সংযুক্ত করার প্রস্তাব দেন, তখন ব্রিটিশরা তাকে স্বাগত জানায়।
পাশ্চাত্যের যেকোনো বড় জাদুঘরে গেলেই আমরা যুদ্ধ ও রাষ্ট্রকৌশল, বিজয় ও কূটনীতির চিত্রায়ণ দেখতে পাব। প্রচ্ছন্ন শিল্পের আড়ালে কিছু ঔপনিবেশিক শিল্পকর্ম শোষণেরই কথা বলে, অন্যগুলোও প্রতিরোধের প্রতীক। প্রতিটি শিল্পকর্মই সম্ভবত আমাদের বর্তমান সংকটগুলোর জন্য শিক্ষা ও উপসংহার তৈরি করে। উইনস্টন চার্চিল ছবি আঁকাতেন। সব সম্ৰাজ্যবাদী মোড়লই তাই করেন। পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞদের আরো বেশি শিল্পকর্ম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। ক্রিস্টোফার প্রিবল সম্প্রতি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, যুদ্ধকে স্মরণকারী স্মৃতিস্তম্ভগুলো যুদ্ধ প্রতিরোধেও সাহায্য করতে পারে কিনা। এগুলোও একটি রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল পুরুষ বা নারীর জন্য অপরিহার্য দক্ষতা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের অংশ হওয়া উচিত। কেননা আজকের সংঘাতগুলোতেও অতীত প্রতিধ্বনিত হওয়া ইতিহাস ও সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ পরিসর বুঝতে হলে ঔপনিবেশিক শিল্পকর্মের জাদুঘরে যাওয়া প্রয়োজন।
শেষ করা যাক ব্রিটিশ অস্ট্রেলিয়ান আর্টিস্ট ভারত পরিব্রাজক মর্টিমার মেনপেসের কথা দিয়ে। ক্লাইভের আত্মহত্যায় যে কাহিনির পরিসমাপ্তি তা ন্যায্য না অন্যায্য কে বলতে পারে? তবে তা ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে একটি কলঙ্ক, এক অত্যন্ত কালো কলঙ্ক। এ সম্পর্কে পড়লে গা গুলিয়ে ওঠে এবং এর কয়েক বছর পর ওয়ারেন হেস্টিংসের অভিশংসনের কারণে আরো একটি প্রায় একই ধরনের কলঙ্ক লেগেছিল। এ দুজন ব্যক্তি, যারা নিঃসন্দেহে ভারতে তাদের সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ ইংরেজ ছিলেন, তারা কি উভয়ই ঘোরতর বদমাশ ছিলেন, নাকি তারা যেমনটা দাবি করতেন, কেবল সেই বদমাশদের বিদ্বেষের শিকার হচ্ছিলেন, যাদের অসততা তারা দমন করার চেষ্টা করেছিলেন? পলাশীর পর...কোম্পানির চিত্রবয়ানের নিরিখ এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার কিছু সূত্র হতেই পারে।