১১তম ছবি মেলা

আলোকচিত্রে প্রান্তিক জীবন ও রূঢ় বাস্তবতার উপস্থাপনা

রাজধানী ঢাকায় পাঁচটি ভেন্যুতে একযোগে চলছে এশিয়ার আলোকচিত্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ উৎসব ১১তম ‘ছবি মেলা’।

রাজধানী ঢাকায় পাঁচটি ভেন্যুতে একযোগে চলছে এশিয়ার আলোকচিত্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ উৎসব ১১তম ‘ছবি মেলা’। এর মধ্যে মূল আয়োজনটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে। বাকি ভেন্যুগুলো হলো বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা, দৃক ভবন ও আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা।

১৬ জানুয়ারি বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক এ আলোকচিত্র উৎসবের উদ্বোধন করা হয়। দৃক পিকচার লাইব্রেরি ও পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এ আয়োজন। উৎসবটি এখন আর নিছক প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ নেই, পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম অন্তর্ভুক্তিমূলক এক সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।

আন্তর্জাতিক পরিসরের অনেক থিম, সংশ্লিষ্ট ছবি, ইনস্টলেশন ও ভিজুয়াল প্রদর্শিত হচ্ছে এ মেলায়। পাঁচটি মহাদেশের ১৮টি দেশ থেকে ৫৮ শিল্পী তাদের কাজ নিয়ে সমবেত হয়েছেন। চিত্রশালাতেই রয়েছে তিনটি আলাদা থিমে ভিডিও কাজ দেখার ব্যবস্থা। শিশুরা যাতে বসে আনন্দঘনভাবে সেটি দেখতে পারে সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রতিদিনই দেশ-বিদেশের আলোকচিত্রী, শিল্পী, সংস্কৃতিপ্রেমী ও শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর হচ্ছে উৎসব প্রাঙ্গণ।

শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালায় চারটি গ্যালারির প্রতিটিতে রয়েছে একাধিক বিষয়ের ওপর উপস্থাপনা। এর মধ্যে দেখা যায় ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় নির্মমতার শিকার মানুষের ছবি। গাজার মানুষের করুণ দৃশ্যগুলো ক্যামেরায় তুলে এনেছেন ফিলিস্তিনি আলোকচিত্রী সামার আবু এলুফ। ফ্রিল্যান্সার আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে তিনি ২০১০ সাল থেকে রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমস ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের জন্য কাজ করছেন। তার ছবির মাধ্যমে বলা হয়েছে সেসব ফিলিস্তিনির গল্প, যারা গাজার সাম্প্রতিক যুদ্ধে আহত হয়েছেন এবং যারা এখন কাতারে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে কেউ পুরো পরিবার হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন, অন্যরা বেঁচে আছেন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও দৃষ্টিশক্তি ছাড়া। আবার অনেকে চিকিৎসার জন্য দেশ ত্যাগ করার কারণে ভালোবাসার মানুষদের থেকে আলাদা হয়ে গেছেন। প্রতিটি গল্পই এমন একেকটি জীবনের ভার বহন করে, যা মুহূর্তের মধ্যেই তাদের জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল।

গাজা শহরে চালানো বোমাবর্ষণে দুই হাতই হারিয়েছে নয় বছরের শিশু মাহমুদ আজুর। এখন তাকে কাতারে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কেমিক্যালের আগুনে দগ্ধ তরুণী বসান্ত আল-লৌহের মুখে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত ও ক্ষত। তার একটা কান উড়ে গেছে। মধ্য গাজা উপত্যকার দেইর আল-বালাহ শহরে যখন তাদের বাড়িতে বোমাবর্ষণ করা হয় তখন সে তার বাবা-মাকে হারায়। উৎসবে প্রদর্শিত এমন ছবি দেখতে গিয়ে দর্শকও যেন অপ্রস্তুতই ছিলেন বলা যায়। নৃশংসতার দৃশ্য দর্শকের হৃদয়ে করে রক্তক্ষরণ। তাই তাদের ছবিগুলোর ক্যাপশন খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তে দেখা যায়।

‘ক্যানারি পাখি আর হাতুড়ি’ শিরোনামে লিসা বার্নার্ডের ছবি স্থান পেয়েছে উৎসবে। চার বছর ধরে চার মহাদেশজুড়ে তোলা তার ছবিগুলোতে মানুষের স্বর্ণভক্তি ও উন্নয়নের নামে চালানো নিষ্ঠুর কর্মযজ্ঞের ভূমিকাকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ছবি, লেখা ও আর্কাইভে সংরক্ষিত উপাদানের মাধ্যমে লিসা বার্নার্ড স্বর্ণের সংঘাতপূর্ণ ইতিহাস এবং যে জটিল প্রক্রিয়ায় এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে মিলিত হয়, তা নিয়ে এক চমকপ্রদ ধারণা তুলে ধরেছেন।

উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে ‘রিতুয়াল ইনহাবিতুয়াল’ শীর্ষক একটি ডিটেইলড ইনস্টলেশন। বিশ্বজুড়ে অ্যাভোকাডো ফলের হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধিতে মেক্সিকোর কৃষি অর্থনীতির মধ্যে মাদক চক্রগুলোর গভীর অনুপ্রবেশ ঘটে। তারা অ্যাভোকাডোর খোলের ভেতরে করে মাদক পাচার করতে থাকে। ফলে গাছ ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মেক্সিকোর মিচোয়াকানের পুরেপেচা জনগোষ্ঠীর এলাকা চেরানে এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহ হয়। ২০১১ সালে একদল স্থানীয় নারী সেই চক্রগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান, যারা ভূমি দখল ও বন সাফ করে অ্যাভোকাডো চাষ করছিল। তাদের প্রতিরোধ একটি পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবে রূপ নিয়ে মাদক পাচারকারী, রাজনৈতিক দল ও দুর্নীতিবাজ প্রশাসনকে বিতাড়িত করে। যার ফলে ওই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা দীর্ঘদিনের নীতির ভিত্তিতে একটি স্বায়ত্তশাসিত সরকার প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পান। এ বাস্তবতাই ‘রিতুয়াল ইনহাবিতুয়াল’ ইনস্টলেশনে তুলে ধরা হয়। এখানে প্রথা, আলোকচিত্র ও প্রতীকী বস্তুর মাধ্যম তৈরি করে এমন এক বয়ান, যা বহু কণ্ঠে ওই জনগোষ্ঠীর স্মৃতির কথা তুলে ধরে।

আরেকটি কাজের শিরোনাম ‘গুমের স্মৃতি’। বাংলাদেশে গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে যে মানসিক ক্ষত তৈরি হয় সেই প্রেক্ষাপটে এটি তৈরি করেছেন মোশফিকুর রহমান জোহান। তিনি একজন নৃবিজ্ঞানী এবং বাংলাদেশে কর্মরত একজন তথ্যচিত্র আলোকচিত্রী।

উৎসবে বিভিন্ন গ্যালারি ঘুরে দেখছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক আরিয়ান ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন তরুণী সেলিন। তারা দুজনই বর্তমানে চীনে লেখাপড়া করছেন। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সেলিন বলেন, ‘এখানে ছবিগুলো দেখে সত্যি আমার ভালো লেগেছে। আবেগাপ্লুতও হয়েছি। এখানে ছবির মাধ্যমে ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতা ও অন্যান্য দেশের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। প্রদর্শনীর মাধ্যমে গাজাবাসীর প্রতি সংহতি জানানো হয়েছে। ফিলিস্তিনের মানুষের কষ্ট ও বঞ্চনাকে বাংলাদেশের মানুষ ধারণ করে নানাভাবে। এ প্রদর্শনীও একটি নিদর্শন। আমি কৃতজ্ঞ।’

উৎসবটি শেষ হবে ৩১ জানুয়ারি। উল্লেখ্য, উৎসবের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী আলোকচিত্র শিল্পকে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক চর্চায় যথাযথ গুরুত্ব না দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি আরো জানান, সে ঘাটতি পুষিয়ে নিতে শিল্পকলা একাডেমিতে বিভাগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ সময় ঢাকাসহ দেশের আটটি বিভাগে এ কার্যক্রম বিস্তারের লক্ষ্যে দৃক ও পাঠশালাকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

১১তম ‘ছবি মেলা’ কেবল একটি আলোকচিত্র উৎসব নয়, বরং সময়ের নৃশংসতা, প্রতিরোধ, স্মৃতি ও মানবিকতার এক শক্তিশালী দলিল। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের রূঢ় বাস্তবতা এখানে ছবির ভাষায় একত্র হয়ে দর্শককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় যে উন্নয়ন, ক্ষমতা ও সহিংসতার এ পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান আসলে কোথায়? শিল্প ও বিবেকের এ উৎসব হয়ে উঠেছে যেন একটি জীবন্ত প্রতিবাদ ও সংহতির মঞ্চ।

আরও