রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ। তিনি বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের সহজ-স্বাভাবিক জীবনের মধ্যকার সৌন্দর্যকে এক অনন্য কাব্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। তার কবিতায় আবহমান বাংলার প্রকৃত রূপ ও দৃশ্য ফুটে ওঠে। বাংলার নদী, মাঠ, বন, গ্রাম, পথ; শালুক-শাপলা, ধানশালিক, বনলতা, ধানখেত, রোদ-বৃষ্টি—এসবই তার কবিতার উপাদান।
দেশের প্রবীণ-নবীন একদল শিল্পী তাদের চিত্রকর্মে কবি জীবনানন্দ দাশের কাব্য ভাষার সেই চিত্ররূপময়তা তুলে ধরেছেন। ধানসিঁড়ি নদীর তীরে একটি ক্যাম্প আয়োজনের মাধ্যমে ২৮জন শিল্পী তাদের রঙ-তুলিতে ৩৩টি ছবি আঁকেন। এর আয়োজক ‘চারুকলা বরিশাল’ শীর্ষক সংগঠন। চিত্রশিল্পীরা হলেন শহিদ কবীর, আবদুল মান্নান, আবদুস সাত্তার, চিন্ময় সিকদার, ফারজানা আহমদ, সামছুল আলম আজাদ, কাজী মোজাম্মেল হোসেন, জিএম খলিলুর রহমান, সোহাগ পারভেজ, জহির উদ্দীন, তাপস কর্মকার, কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়, অপূর্ব দাস, জাহিদুর রহমান খান, অমলেন্দু মণ্ডল, কুন্তল বাড়ই, এনামুজ জাহিদ, পলক দাস, অরুণ চন্দ্র বর্মণ, স্মিতা রায়, আল আকসা, সালমা শিরীন, নুরুন্নাহার, পার্থ রায়, সুজাতা সেন, ফাইজুল ইসলাম, অভিষেক বসু ও ধনঞ্জয় বসু।
শহিদ কবীরের চিত্রকর্ম
শিল্পীদের কেউ এঁকেছেন ধানসিঁড়ি নদী। কেউ এঁকেছেন চালতা ফুল ও ভোরের দোয়েল। আছে চিল, পেঁচা, হাঁস, ডিঙিসহ কবির প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গ। জীবনানন্দের কবিতার চরণ উল্লেখ করেও ছবি আঁকা হয়েছে। তবে জীবনানন্দের ধানসিঁড়ি নদীর ছবি এঁকেছেন একাধিক শিল্পী। শিল্পী তাপস কর্মকার বলেন, ‘কবি লিখেছেন, “আবার আসিব ফিরে/ধানসিঁড়িটির তীরে।” কবি যে ধানসিঁড়ির তীরে ফিরে আসতে চেয়েছেন, এ কারণেই আমি রঙ-তুলিতে নদীটিকে এঁকেছি।’
ক্যাম্পেইনে ছবি এঁকেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের পেইন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও শিল্পী আব্দুল সাত্তার তৌফিক। তিনি জানান, চিত্রশিল্পীরা জীবনানন্দ দাশের কবিতার বিশেষ করে তার নিসর্গের দারুণ ভক্ত। তাই কবিতা ও চিত্রশিল্প হাত ধরে পাশাপাশি হেঁটেছে।
চারুকলা বরিশালের সংগঠক সুশান্ত ঘোষ বলেন, ‘এমন ব্যতিক্রমী আর্ট ক্যাম্প করার মূল কারণ ছিল কবির লেখায় বারে বারে ধানসিঁড়ি নদীর কথা এসেছে। তেমনি নিসর্গের নানা রূপের বর্ণনাও ফুটে উঠেছে। এগুলোর সঙ্গে চিত্রশিল্পীদের পরিচয় করিয়ে দেয়া, যাতে শিল্পীরা কবির মনের ভূমিটি বুঝতে পারেন এবং চিত্রকলায় সেই রঙ ও নিসর্গের রূপটি ফুটিয়ে তুলতে পারেন। এরই মধ্যে কবির জন্মের ১২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। তার মৃত্যুর ৭১ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। অথচ কবিকে নিয়ে নানা আঙ্গিকে কাজ হয়েছে তুলনামূলক কম। কবির কাব্য নিয়ে প্রচুর আলোচনা আছে। বরিশাল অঞ্চলের প্রকৃতি বলতে গেলে নদীনির্ভর গ্রাম। এটাই বাংলার চিরন্তন প্রকৃতি। এটি আমাদের চিত্রকলাকে বারে বারে আন্দোলিত করলেও কবির লেখায় যে রূপ সেটি চিত্রশিল্পীদের ছবিতে উঠে আসেনি। আমাদের আয়োজনে কবিতা ও চিত্রকলাকে পাশাপাশি দেখানো হয়েছে। কবির প্রকৃতি ও চিত্রকলায় নিসর্গ যেন কবির লেখারই চিত্ররূপময় রূপ। সেই হিসেবে আর্ট ক্যাম্পের ছবিগুলো ধরা দিয়েছে কবির আকাঙ্ক্ষিত প্রকৃতি হিসেবে।’
উল্লেখ্য, ২৮ শিল্পীর ছবিগুলো নিয়ে ২২-২৩ নভেম্বর দুই দিনব্যাপী ঢাকার লালমাটিয়ার ভূমি গ্যালারিতে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করেন চিত্রশিল্পী শহিদ কবীর। ব্যতিক্রমী আয়োজন সম্পর্কে শহিদ কবীর বলেন, ‘জীবনানন্দ দাশ যে প্রকৃতির কথা কবিতায় তুলে এনেছেন, চিত্রশিল্পীরা রঙ ও রূপরেখায় সেটিই তুলে ধরেছেন। কবির প্রতি এটাই চিত্রশিল্পীদের শ্রদ্ধার্ঘ্য। কোনো অশুভ শক্তি বাংলার এ সৃজনশীলতা ধ্বংস করতে পারবে না।’
পরবর্তী সময়ে বরিশালে, বিশেষ করে ধানসিঁড়ি নদীর তীরে আরেকটি প্রদর্শনী করা হবে বলে জানান চারুকলা বরিশালের সংগঠকরা।
জীবনানন্দ দাশের কাব্যে বাংলার যে রূপ উন্মোচন হয়েছে, তারই একটি দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি ধানসিঁড়ি তীরের এ শিল্পায়োজন। কবির শব্দে বোনা প্রকৃতি যখন শিল্পীদের তুলির আঁচড়ে রূপ পায়, তখন কাব্য ও চিত্রকলা; দুটি মাধ্যম পরস্পরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। নদী, পাখি, ভোরের আলো, গ্রামীণ পথ—জীবনানন্দের নিসর্গ যে অনুভবের বিস্তার তৈরি করেছে, শিল্পীরা তা রঙের স্তর ও ফর্মের বুননে নতুন মাত্রায় প্রকাশ করেছেন। যেখানে বাংলার চিরন্তন প্রকৃতি তার স্বভাব ও সৌন্দর্যসহ উপস্থিত। ধানসিঁড়ি নদীর ঢেউ যেমন অবিরাম, তেমনি জীবনানন্দের প্রকৃতি ও চিত্রশিল্পের এ মিলনও অনির্বাণ হয়ে থাকবে ভবিষ্যৎ সৃজনশীলতার পথরেখায়।