ফ্রিদা কাহলোর ১৯৪০ সালের সেলফ পোর্ট্রেট ‘এল সুইনো (লা কামা)’। ছবিটি গত ২০ নভেম্বর নিউইয়র্কের সদবি’জে ৫ কোটি ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর মূল্য ৬৬৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকার কিছু কম। নিলামে বিক্রীত কোনো নারী শিল্পীর চিত্রকর্মের মধ্যে এটিই সবচেয়ে দামি। পাশাপাশি এটি হয়ে উঠল ইতিহাসে সর্বাধিক মূল্যবান লাতিন আমেরিকান শিল্পকর্ম। ‘এক্সকুইজিট কর্পাস’ নামের যে ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে এটি নিলামে তোলা হয়েছিল, সেখানে সুররিয়ালিজমের ব্যাপ্তি, গভীরতা ও সাহসিকতাকে ধারণ করে এমন ৮০টিরও বেশি কাজ ছিল। মজার ব্যাপার, সদবি’জের নতুন ব্রয়ার বিল্ডিং সদর দপ্তরে প্রদর্শিত এ চিত্রটি ১৯৮০ সালে মাত্র ৫১ হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছিল।
বিষয়টি প্রমাণ করে যে ফ্রিদা কাহলোর শিল্পকর্মের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তিনি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী। নানা মাধ্যমে চিত্রকর্ম তৈরি করেছেন তিনি। তবে এর মধ্যে সেলফ পোর্ট্রেটের কারণেই বেশি আলোচিত। আমাদের দেশেও ব্যাগে, ব্লাউজে, নোটবুকের মলাটে ফ্রিদার মুখ দেখা যায়। কিন্তু কেবল জনপ্রিয়তা নয়, আর্টের বৈশ্বিক বাজারে তিনি এখনো অন্যতম চরিত্র হয়ে উঠেছেন। প্রশ্ন হলো, কেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিষয়টি কীভাবে সম্ভব হলো?
শুরুতে উল্লিখিত নিলাম পর্যালোচনা করা যাক। বিক্রির বুলি শুরু হয় ২ কোটি ২০ লাখ ডলার থেকে। খুব দ্রুতই ঘরে উপস্থিত ও ফোনে যুক্ত থাকা বিডারদের কারণে দাম বাড়তে থাকে। মাত্র ৪ মিনিটে এর দাম ৪ কোটি ৭০ লাখ মিলিয়ন ডলারে উঠে যায়। সেই দামেই বিক্রি হয় ছবিটি। তবে ফিসহ চূড়ান্ত মূল্য দাঁড়ায় ৫ কোটি ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
এ রেকর্ডের মাধ্যমে কাহলো ২০২১ সালে দিয়েগো ওয়াই ইয়োর (১৯৪৯) রেকর্ড ভাঙেন। ছবিটি সে সময় ৩ কোটি ৪৯ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছিল। নারী শিল্পীদের সর্বোচ্চ দামের চিত্রকর্মের রেকর্ডটি ছিল জর্জিয়া ও’কিফের ‘জিমসন উইড/হোয়াইট ফ্লাওয়ার’-এর। ২০১৪ সালে ৪ কোটি ৪৪ লাখ ডলারে ছবিটি বিক্রি হয়েছিল (যদিও বর্তমান মূল্যমান অনুযায়ী তার দাম হতো ৬ কোটি ৫ লাখ ডলার)।
‘এল সুইনো (লা কামা)’য় কাহলোকে দেখা যায় লতায় জড়ানো একটি ভাসমান বিছানায় শুয়ে থাকতে। আর বিছানার ওপরে একটি ফুলের মুকুট পরা কঙ্কাল হাতে ডিনামাইট মোড়ানো একগুচ্ছ ফুল ধরে আছে। নিজের বিবাহবিচ্ছেদ এবং প্রেমিক লিও ট্রটস্কির হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস পর আঁকা কাজটিতে ফিরে এসেছে কাহলোর চিত্রভাষার একটি কেন্দ্রীয় মোটিফ—বিছানা, যা তার কাছে ছিল যন্ত্রণার, আরোগ্যের ও সৃষ্টির জায়গা। ছোটবেলার অসুখ এবং ১৮ বছর বয়সে প্রায় প্রাণঘাতী বাস দুর্ঘটনার কারণে তাকে দীর্ঘ সময় বিছানায় কাটাতে হয়েছে।
ফ্রিদা লিখেছিলেন, ‘আমি কখনো স্বপ্ন আঁকি না। আমি আমার বাস্তবতা আঁকি।’ বহু সুররিয়ালিস্ট শিল্পী—যেমন আন্দ্রে ব্রেতোঁ—তাকে নিজেদের আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখতে চাইলে তিনি শুরু থেকেই সেই লেবেল প্রত্যাখ্যান করেন। নিজেকে সুররিয়ালিস্ট বলতে রাজি ছিলেন না ফ্রিদা।
এ সময়ে কাহলোর শিল্পের পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। কাহলো তার জীবদ্দশায় কাজের প্রকৃত স্বীকৃতি পাননি। দশকের পর দশক তিনি মূলত দিয়েগো রিভেরার স্ত্রী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন এবং তার শিল্পকর্মের বাজারমূল্য আজকের মতো ছিল না। উদাহরণস্বরূপ ১৯৩৯ সালে জুলিয়েন লেভি গ্যালারিতে প্রদর্শনীর সময় অভিনেতা এডওয়ার্ড জি রবিনসন যখন তার চারটি ছবি ২০০ ডলার করে কিনে নেন, তখন কাহলো বিস্মিত হয়েছিলেন।
তার পুনর্মূল্যায়ন শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকে, হেইডেন হেরেরার ‘ফ্রিদা: আ বায়োগ্রাফি’ প্রকাশের মাধ্যমে। হেরেরার গবেষণায় উঠে আসে কাহলোর নারীবাদী গুরুত্ব প্রথম গড়ে ওঠে চিকানো সম্প্রদায়ের মধ্যে। সেখানে মার্কিন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী নারী অভিবাসীরা কাহলোর মধ্যে নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতেন। এরপর চিকানো নারীবাদ তাকে আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে। সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক প্রভাবশালী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গ্যালেরিয়া দে লা রাজা মেক্সিকোর বাইরে প্রথম কাহলোকে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরে। জুডি শিকাগো থেকে জুলিয়ান শনাবেল পর্যন্ত বহু বড় শিল্পী পরবর্তী সময়ে তার কাজ ও ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানান। এর পরই বিশ্বজুড়ে ফ্রিদা পরিচিত হতে শুরু করেন।
জীবন, নন্দন, সক্রিয়তা, ব্যথা ও প্রাণশক্তি—সব মিলিয়ে তিনি এমন এক ভিজুয়াল ভাষা তৈরি করেছেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করেছে। সদবি’জের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আনা দি স্তাসি আর্টসিকে বলেন, ‘বাজার অনেক সময় চলতি প্রবণতার দিকে ঝোঁকে, কিন্তু ফ্রিদা কাহলো তার ব্যতিক্রম। ১৯৮০-এর দশক থেকে তিনি সবসময় চাহিদার শীর্ষে। কাহলোর কাজ জীবনীভিত্তিক, গভীরভাবে মেক্সিকান একটি আত্ম-অন্বেষণ, যা শরীর, লিঙ্গ ও পরিচয় নিয়ে সমসাময়িক আলোচনার সঙ্গে কথা বলে। সংগ্রাহকদের আগ্রহের কেন্দ্রে এ সংযোগগুলো ভূমিকা রাখে।’
আর্জেন্টিনার মালবা জাদুঘরে এ প্রভাব বিশেষভাবে দৃশ্যমান। এর আর্টিস্টিক ডিরেক্টর রদ্রিগো মউরা কাহলোর চিত্রশৈলী ও প্রতীকী শক্তি উভয়কেই গুরুত্ব দেন। এখানে দিয়েগো ওয়াই ইয়ো (১৯৪৯) ও অতোরোরো কন চ্যাঙ্গো ওয়াই লোরে (১৯৪২) প্রদর্শিত হচ্ছে। ছবি দুটি জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা এদুয়ার্দো কস্তান্তিনি ২০২১ ও ১৯৯৫ সালে সংগ্রহ করেছিলেন। দ্বিতীয় ছবিটির মূল্য ৩২ লাখ ডলার।
আর্টসিকে মউরা বলেন, ‘ফ্রিদা অসাধারণ এক চিত্রশিল্পী এবং মজার বিষয় হলো, সেটা নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। তিনি লাতিন সংস্কৃতির প্রতীক এবং লিঙ্গ ও পরিচয়বিষয়ক আলোচনাকে সামনে নিয়ে আসেন।’
কাহলোর আকর্ষণ নতুন রূপ পেয়েছে মেক্সিকো সিটির কোয়োআকানে চালু হওয়া ‘মিউজিও কাসা কাহলো’র মাধ্যমে। এটি বিখ্যাত কাসা আজুল থেকে কয়েক মিনিট দূরে। সেপ্টেম্বরে খোলা জাদুঘরটি তার শৈশব ও পারিবারিক জীবনের প্রতি নিবেদিত। পরিচালক আদান গার্সিয়া ফাহার্দো বলেন, ‘ফ্রিদার এতগুলো দিক আছে এবং প্রতিটিতেই এত শক্তি, সেজন্য তিনি মানুষকে বারবার আকর্ষণ করেন।’
ফ্রিদার কাজের আর্থিক মূল্য নিয়ে তিনি বলেন, ‘তুমি যতই মূল্য নির্ধারণ করো, যদি সেটা হারিয়ে যায়, পুড়ে যায় বা চুরি হয়, তার কোনো বিকল্প নেই। কোনো অর্থেই ফ্রিদা কাহলোর কাজ প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়।’
ফ্রিদা নিজেকে সুররিয়ালিস্ট বলতে নারাজ ছিলেন। তবে কাহলোর প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাতিন আমেরিকার নারী সুররিয়ালিস্ট শিল্পীদের বাজারও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালে লিওনোরা ক্যারিংটনের ‘লা ডিসট্র্যাকশিওনেস দে দাগোবের্তো’ (১৯৪৫) ২ কোটি ৮৪ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছে। ছবিটি ৩০ বছর আগে মাত্র ২ লাখ ৯৯ হাজার ৫০০ ডলারে বিক্রি হয়েছিল।
লাতিন আমেরিকার শীর্ষ পাঁচ নিলাম বিক্রিতে কাহলো ছাড়াও রয়েছেন রিভেরা (ছবির মূল্য ১ কোটি ৫৭ লাখ), উইফ্রেডো লাম (ছবির মূল্য ৯৬ লাখ) ও রুফিনো তামায়ো (ছবির মূল্য ৭২ লাখ ডলার)। কিন্তু এদের সবাইকে ছাড়িয়ে কাহলো এখনো শীর্ষে।
এ সবকিছুই প্রমাণ করে, ফ্রিদা কাহলোর আকর্ষণ শুধু টিকে নেই, বরং আরো বিস্তৃত হচ্ছে। সীমান্ত অতিক্রম করে নতুন নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
[লেখাটি তৈরিতে আর্টসিতে প্রকাশিত মার্সেদেজ এজকুইয়াগার নিবন্ধের সাহায্য নেয়া হয়েছে]