শিল্পীরা যেভাবে শহরকে এঁকেছেন

চিত্রশিল্পের ইতিহাসে শহরকে পাওয়া যায় গুরুত্বপূর্ণ ও অনুপ্রেরণা হিসেবে।

(গত সংখ্যার পর)

চিত্রশিল্পের ইতিহাসে শহরকে পাওয়া যায় গুরুত্বপূর্ণ ও অনুপ্রেরণা হিসেবে। শহর শুধু স্থাপত্য বা মানুষের ভিড়ের সমষ্টি নয়, এটি সময়ের স্পন্দন, আধুনিকতার প্রতিচ্ছবি, মানুষের জীবন-জীবিকা ও দৈনন্দিন নানা কর্মকাণ্ডের ক্যানভাসও। প্রাচীন নগরের রূপরেখা থেকে শুরু করে আজকের আকাশছোঁয়া ভবন পর্যন্ত, শিল্পীরা শহরকে এঁকেছেন কখনো উচ্ছ্বাসে, কখনো শূন্যতায়, আবার কখনো শৃঙ্খলা ও স্বপ্নের নান্দনিকতা দিয়ে।

ইমপ্রেশনিজম ও আধুনিক প্যারিস

ইমপ্রেশনিজম হলো উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকে ফ্রান্সে বিকশিত চিত্রকলার একটি শৈলী। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে প্যারিস শহরের ভেতরের গঠন ও রূপ পরিবর্তনের জন্য বড় ধরনের সংস্কারকাজ করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল ফরাসি রাজধানী প্যারিসকে ইউরোপের সবচেয়ে আধুনিক ও নানন্দিক নগরীতে রূপান্তর করা। নেপোলিয়ন তৃতীয় জর্জ এ প্রকল্পের জন্য ইউজিন হসমানকে দায়িত্ব দেন। এ পরিবর্তনই পরে পরিচিত হয় ‘হসমানের প্যারিস’ নামে। আধুনিকতার এ নতুন রূপ ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের কাছে ছিল এক আকর্ষণীয় বিষয়। প্রখ্যাত শিল্পী ক্লদ মনেঁ, ক্যালিয়েবতে, রেনোয়া, পিসারো, এমনকি ভ্যান গঘ পর্যন্ত নতুন প্যারিসকে আধুনিক চিত্রকর্মের মডেল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

শহরের সাধারণ দৃশ্যের পাশাপাশি ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রশিল্পীরা আধুনিক শহরের উদ্ভাবনী উপাদানগুলো দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন। এর প্রভাবে তাদের হাতে তৈরি হয় বিখ্যাত অনেক চিত্রকর্ম। এর মধ্যে গুস্তাভ কেলিয়েবতের বিখ্যাত"‘প্যারিস স্ট্রিট, রেইনি ডে’"(১৮৭৭) ও ক্যামিল পিসারোর আকর্ষণীয়"‘দ্য বুলেভার্দ মন্তমার্ত্রে অ্যাট নাইট’"(১৮৯৭) শীর্ষক চিত্রকর্ম অন্যতম। প্যারিসের শিল্পীরা আধুনিক রেলওয়ে ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত উপাদানগুলো দ্বারাও আকর্ষিত হন। ফলে রেল স্টেশনগুলো ইমপ্রেশনিস্ট আইকনোগ্রাফির" একটি কেন্দ্রীয় অংশ হয়ে ওঠে। এর মধ্যে ‘সেন্ট-লাজারে রেলস্টেশন’-এ সেই শিল্পস্বপ্ন ও শিল্পকল্পনার সম্পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায়। ক্লদ মনেঁর বহুল আলোচিত ‘লা গ্যারে সেন্ট লাজারে (সেন্ট লাজারে স্টেশন, ১৮৭৭) সে সময়ের শিল্প সমালোচকদের দ্বারাও ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। এটিকে সমকালে ইমপ্রেশনিজমের ধারায় অস্বাভাবিক নির্মাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গুস্তাভ ক্যালিয়েবতও প্যারিসের রেলওয়ের প্রতি স্পষ্টভাবে মুগ্ধ ছিলেন। যেমনটি তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম"‘দ্য ব্রিজ অব ইউরোপ’"(১৮৭৬)-এ দেখা যায়।

আমেরিকার শহরচিত্র, হুইসলার থেকে ডিবেনকর্ন

জেমস অ্যাবট ম্যাকনেইল হুইসলার (১৮৩৪-১৯০৩) উনিশ শতকে আমেরিকান চিত্রশিল্পীদের মধ্যে বিখ্যাত। সমকালে যেসব শিল্পী শহরচিত্র এঁকেছেন তাদের মধ্যেও তিনি অন্যতম। রাতের দৃশ্যাবলি-সংশ্লিষ্ট আমেরিকা ও ইউরোপের শহরচিত্র, বিশেষ করে ‘নকটার্ন ইন ব্ল্যাক অ্যান্ড গোল্ড: দ্য ফলিং রকেট’ (১৮৭৪) এ ধারার কাজে হুইসলারকে অনন্য স্থান দিয়েছে।

হুইসলারের পর সবচেয়ে পরিচিত শিল্পী ছিলেন চাইল্ড হাসাম (১৮৫৯-১৯৩৫), যাকে আমেরিকান ইমপ্রেশনিজমের প্রধান শিল্পী হিসেবে ধরা হয়। তার ‘দি এভিনিউ ইন দ্য রেইন’ (১৯১৭) আজও মার্কিন শিল্পের প্রতীকী চিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ শতকের শুরুতে ‘অ্যাশকান স্কুল’ নামে একদল বাস্তববাদী শিল্পী নিউইয়র্কের দৈনন্দিন জীবনকে আঁকা ছবিতে তুলে ধরতে শুরু করেন। এদের নেতৃত্ব দেন রবার্ট হেনরি। তার পর জর্জ বেলোজ ও এডওয়ার্ড হপারও এ ধারার কাজ করেন।

জর্জ বেলোজ নিউইয়র্কের নিম্নমধ্যবিত্তের জীবনকে রঙ-তুলিতে এঁকেছেন। এ ধারার তার বিখ্যাত কাজ হলো ‘ক্লিফ ডিউলারস’ (১৯১৩) ও ‘নিউইয়র্ক’ (১৯১১)। এডওয়ার্ড হপারকে বলা হয় ‘নগর নিঃসঙ্গতার চিত্রকর’। তার বিখ্যাত ‘নাইটহকস’ (১৯৪২) শীর্ষক চিত্রকর্ম আজও নগরজীবনের নির্জনতার প্রতীক।

নগরচিত্রে অগ্রগামী শিল্পের দৃষ্টি

শিল্পের ইতিহাসে অগ্রগামী বা আভাঁ-গার্দের সময়টি শহর চিত্রকলায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। এ সময়ের শহরচিত্রগুলোকে অনেক বৈচিত্র্যময়, জটিল ও নান্দনিক অনুসন্ধানী কাজ হিসেবে দেখা হয়। নগরচিত্র তখন আর শুধু কোনো শহরের স্থাপত্য বা দৃশ্যপটেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আধুনিকতার ভেতরে মানুষের অবস্থান, শিল্পায়ন ও যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিকতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

আধুনিক শিল্প আন্দোলনকারীদের মধ্যে ফার্নান্দ লেজে ছিলেন নগরচিত্রকলার অন্যতম স্থপতি। তার ‘দ্য সিটি’ (১৯১৯) কেবল একটি চিত্রকর্ম নয়, বরং আধুনিক শহরের যান্ত্রিক গতি, গঠন ও শক্তির এক অনন্য ভিজুয়াল হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে রবার্ট দেলনের ‘চ্যাম্পস দে মার্স, দ্য রেড টাওয়ার’-এ (১৯১১) তুলনামূলকভাবে প্রচলিত রীতিতে শহরচিত্র উপস্থাপন করেন, তাতে আধুনিক শহরের উজ্জ্বল রঙ, আলো আর গতি ফুটিয়ে তোলা হয়।

প্যারিস স্কুলের শিল্পীরা ফরাসি রাজধানীকে নিজেদের দৃষ্টিতে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন। হেনরি মাতিসের ‘আরব সিটি (১৯০৫) কিংবা রাউল ডুফির ‘স্ট্রিট ডিকেড উইথ ফ্ল্যাগস’ (১৯০৬) রঙ ও উচ্ছ্বাসের চিত্রকর্ম। অন্যদিকে মার্ক শাগালের ‘প্যারিস থ্রু দ্য উইনডো (১৯১৩) দর্শকদের সামনে হাজির করে এক রহস্যময় ও দুর্বোধ্য প্যারিস, যেখানে বাস্তব ও কল্পনার মিশ্রণে এক স্বপ্নময় পৃথিবীর ধারণা দেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মান সমাজকে নির্মমভাবে চিত্রিত করেছিলেন জর্জ গ্রস। তার ‘মেট্রোপলিস’ (১৯১৭) এবং ‘দ্য ফিউনারেল অসকার পানিজ্জা’ (১৯১৭-১৮) শীর্ষক ছবিগুলোয় দেখা যায়, এক বিভ্রান্ত দিশাহীন বাস্তবতায় যুদ্ধের ক্ষতবিক্ষত শহর ও সমাজকে।

সমকালীন শহর: ফটোরিয়ালিজম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শহরচিত্রকলার ব্যাপক বিকাশ ঘটে। ধারাটি দেখা যায় অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের কাজেও। যেমন জোয়ান মিচেলের ‘সিটি ল্যান্ডস্কেপ’ (১৯৫৫)। উইলেম দে কুনিংয়ের এ ধরনের কিছু পরীক্ষামূলক ছবি আছে।

১৯৪০-এর শেষে এবং ১৯৫০-এর শুরুর দিকে প্রভাবশালী অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম থেকে সরে গিয়ে, ‘বে এরিয়া ফিগারেটিভ মুভমেন্ট’-এর শিল্পীরা ফিগারেটিভ বা বাস্তবঘনিষ্ঠ ছবি আঁকেন। রিচার্ড ডাইবেনকর্ন (১৯২২–১৯৯৩) তার শিল্পজীবনের শুরুতে অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজমে কাজ করলেও পরে ফিগারেটিভ ভাষা গ্রহণ করেন।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শহরচিত্রকলায় সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন ফটোরিয়ালিস্ট ও হাইপাররিয়ালিস্ট শিল্পীরা। ফটোরিয়ালিজমের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম রিচার্ড এস্টেস (জন্ম ১৯৩২)। তিনি সম্ভবত জর্জ বেলোসের পর নিউইয়র্ক শহরচিত্রকলার সবচেয়ে প্রভাবশালী শিল্পী। তার কাজের পরিধি ১৯৬৭ সালের অসাধারণ চিত্রকর্ম ‘হর্ন ‍অ্যান্ড হার্ডার্ট অটোম্যাট’ থেকে শুরু করে ২০১০ সালের আঁকা ‘ব্রডওয়ে বাস স্টপ, নিয়ার লিংকন সেন্টার’ পর্যন্ত বিস্তৃত।

শহরচিত্রকলার যাত্রাপথটি অনেক দীর্ঘ। বিভিন্ন সময় শিল্পীদের আঁকা বিখ্যাত সব চিত্রকর্ম আমাদের জানায়, শহর বা নগর শুধু স্থাপত্য, সড়ক কিংবা আলোকসজ্জার সমাহার নয়, এটি মানবসমাজের পরিবর্তন, মানসিকতার রূপান্তর এবং সভ্যতার বিকাশের প্রতীক। ইমপ্রেশনিজমে রেলস্টেশন কিংবা ভেজা প্যারিসের রাস্তা যেমন আধুনিকতার প্রথম আলো দেখিয়েছিল, তেমনি কিউবিজম, ফিউচারিজম ও আভাঁ-গার্দ ধারা নগরকে এক নতুন ভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করেছে।

শহরচিত্রকে এক বহুমাত্রিক আয়নার সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে শিল্পভাষায় স্বপ্নের উজ্জ্বলতা, আধুনিকতার আকাঙ্ক্ষা, যুদ্ধের দগদগে ক্ষত এবং মানুষের বাস্তব জীবনকে প্রতিফলিত করে।

[দি আর্ট উল্ফ ডটকমে প্রকাশিত জি. ফার্নান্দেজের ‘পেইন্টিং দ্য সিটি: দ্য হিস্ট্রি অব সিটি স্কেপস’ শীর্ষক নিবন্ধ অবলম্বনে রচিত] (সমাপ্ত)

আরও