মানব সভ্যতার ইতিহাস শহরের বিকাশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নগর শুধু বসতির স্থান নয়, এটি মানুষের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রও। এ কারণে শহর সবসময়ই শিল্পীদের কাছে এক অশেষ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। শিল্পীর চিত্রকলার ভাষায় শহর কখনো হয়ে উঠেছে মহিমাময় সভ্যতার প্রতীক, আবার কখনো নিঃসঙ্গ ও বেদনাময় বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রাচীন দেয়ালচিত্র থেকে শুরু করে ফটোরিয়ালিস্ট ক্যানভাস (নিখুঁত বাস্তবধর্মী ছবি যা দেখতে প্রায় ক্যামেরায় তোলা ফটোগ্রাফির মতো মনে হয়) পর্যন্ত শহর নিয়ে আঁকা চিত্রকর্মের যাত্রা অনেক দীর্ঘ। এর গুরুত্বও অনেক। এর মাধ্যমে মানুষ নিজের বসতি ও সময়কে শিল্পকর্মে অমর করে রেখেছে।
শহর নিয়ে চিত্রকর্ম করা ঠিক কবে শুরু হয় তার ইতিহাস সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা কঠিন। অবশ্য প্রথম শহরের জন্ম নিয়েও বিতর্ক আছে। সাধারণত মেসোপটেমিয়ার উর বা অন্য নগরীগুলোকে প্রথম শহর ধরা হয়, তবে দক্ষিণ আনাতোলিয়ার চাতালহয়ূকেও অনেকে প্রথম শহর মনে করেন। একইভাবে নগরচিত্র শিল্পের শুরুর সঠিক সময় নির্ধারণ করা যায়নি।
গ্রিসের সান্টোরিনি দ্বীপের আক্রোটিরিতে দেয়ালের ওপর ভেজা চুন-সুরকির প্রলেপে আঁকা একটি রহস্যময় চিত্র পাওয়া গেছে, যা ‘শিপ প্রসেস ফ্রেসকো’ বা ‘ফ্লটিলা ফ্রেসকো’ নামে পরিচিত। এতে দুটি দুর্গবেষ্টিত শহরের মাঝে নৌযাত্রার দৃশ্য আঁকা হয়েছে। একই ধরনের চিত্রের আরেকটি উদাহরণ হলো ‘সিটি ফ্রেসকো’, যা ১৯৯৭ সালে রোমের ট্রাজানের স্নানাগারে আবিষ্কৃত হয়। এটি একটি সমুদ্রতীরবর্তী শহরের (বাস্তব বা কল্পিত) আকাশদৃশ্য এবং একে চিত্রকলার ইতিহাসে প্রথম পূর্ণাঙ্গ শহরচিত্র হিসেবে ধরা হয়। এছাড়া পম্পেইয়ের কাছে কিছু রোমান ফ্রেসকো পাওয়া গেছে, যেখানে আংশিকভাবে সমুদ্রতীরবর্তী শহরের চিত্র ফুটে উঠেছে।
মধ্যযুগ থেকে রেনেসাঁকালে শহরচিত্র
মধ্যযুগে অলংকৃত পুঁথি ও ধর্মীয় চিত্রে শহরের আংশিক ছবি পাওয়া যায়। অবশ্য এগুলো পূর্ণাঙ্গ নয়, পার্শ্বচরিত্র। রেনেসাঁর শুরুতে ইউরোপীয় চিত্রকলা বাইজেন্টাইন নগরীর কঠোরতা থেকে মুক্ত হয়ে নতুনত্ব ও আধুনিকতার দিকে অগ্রসর হয়। এ প্রেক্ষাপটে অ্যামব্রোজিও লোরেন্ত্সি’র নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার ‘সিটি বাই দ্য সি’ (১৩৩৫) পশ্চিমা শিল্পে প্রথম পূর্ণাঙ্গ শহরচিত্র। তার আরেক বিখ্যাত কাজ হলো ‘অ্যালিগরি অব গুড গভর্নমেন্ট’ (১৩৩৮–৪০, সিয়েনা)। এটি নাগরিক জীবন, স্থাপত্য ও সামাজিক সম্পর্কের এক অনন্য দলিল, যা বিশ শতকের অ্যাভঁ-গার্দ শিল্পের পূর্বাভাস মনে হয়।
রেনেসাঁ পর্বে ভেনিসের শিল্পীরা, বিশেষ করে ভিত্তোরে কারপাচ্চিও ও জেন্তিলে বেল্লিনি শহরকে প্রধান বিষয়বস্তু হিসেবে ক্যানভাসে উপস্থাপন করেন। এটি ছিল শহরচিত্রের প্রথম সোনালি যুগ। অন্যদিকে, উত্তর ইউরোপে জান ভ্যান আইক তার ‘ম্যাডন্না অব দ্য চ্যান্সেলর রলিন’ চিত্রে চমৎকারভাবে নদীতীরবর্তী শহরের দৃশ্য যোগ করেন। তবে সেটিকে অনেকে শহরচিত্রের পার্শ্বচরিত্র হিসেবেই মনে করেন।
নগরচিত্রের বিকাশ: ডেল্ফ্ট স্কুল
নেদারল্যান্ডসের পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দর শহর ডেল্ফ্ট রেনেসাঁ যুগের শেষভাগ থেকেই বহু শিল্পীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায় হেনড্রিক কর্নেলিস্ ভ্রুমের (১৫৬৬-১৬৪০)- আঁকা ‘ডেল্ফ্ট ভ্যানুতি হ্যাট ওয়েস্টার্ন’ (প্রায় ১৬১৫ খ্রি.) শীর্ষক চিত্রকর্মে। তবে সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে, বিশেষ করে ১৬৫৪ সালে শহরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর, যেটি শিল্পী এগবার্ট ভ্যান ডের পোয়েল ‘এক্সপ্লোজন ইন ডেল্ফ্ট’ নামে অঙ্কন করেছিলেন। তখনই ‘ডেল্ফ্ট স্কুল’-এর শীর্ষ সময় আসে।
য়োন ভার্মিয়ার (১৬৩২-১৬৭৫) ছিলেন এ ধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী। তিনি খুব বেশি ছবি আঁকেননি, তবে তার মাত্র ৩৫টি কাজ পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটি নগরচিত্র শিল্পকলার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। তার প্রথম বিখ্যাত নগরচিত্র হলো ‘ভিউ অব ডেল্ফ্ট’ (১৬৬০-১৬৬১), যেটিকে লেখক মার্সেল প্রুস্ত একসময় বলেছিলেন ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ছবি’। এ ছবিতে ডেল্ফ্টের স্থাপত্য এমন নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল যে অনেক সমালোচক ভেবেছিলেন ভেরমেয়ার হয়তো ক্যামেরা ব্যবহার করেছিলেন। তবে এ দাবির নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি। এটি আঁকা ছবিই ছিল।
দ্বিতীয়টি হলো ‘আ স্ট্রিট ইন ডেল্ফ্ট’ বা ‘দ্য লিটল স্ট্রিট (১৬৬১, রাইকস মিউজিয়াম, আমস্টারডাম)। এ শিল্পকর্ম ‘ভিউ অব ডেল্ফ্ট’-এর মতো খ্যাতি না পেলেও এতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন অসমমিত বিন্যাস এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্য। এসব বৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালে বিশ শতকের নগরচিত্রের বিশেষ ও নান্দনিক শৈলীর পূর্বাভাস দিয়েছিল।
ভেদুতা ও ভেনিসের গৌরব
১৮ শতকে ইউরোপের অভিজাতরা ভেনিস ভ্রমণ করে নগরের আলো-ছায়াকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ধরে রাখতে চাইতেন। এখান থেকেই ভেদুতা চিত্রকলার যাত্রা শুরু হয়।
এ ধারার শ্রেষ্ঠ শিল্পী ক্যানালেত্তো, তার ‘দ্য স্টনমেসনস ইয়ার্ড’ শীর্ষক ছবিতে ভেনিসকে এমনভাবে আঁকলেন যে এক সমালোচক বলেছিলেন, ‘তিনি তাঁর ছবিতে সূর্যের আলোকে জীবন্ত করে তুলেছেন।’ ক্যানালেত্তো শুধু ভেনিস নয়, ইংল্যান্ডের নগরচিত্র এঁকেও জনপ্রিয়তা পান। তার উত্তরসূরি বার্নার্দো বেলোত্তো ও ফ্রান্সেসকো গুয়ার্দিও ভেনিসকে নগরচিত্রের অনন্য কেন্দ্র করে তোলেন।
এশিয়ার শহরচিত্র
চীনা শিল্পকলায় মূলত প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে বিংশ শতাব্দীর আগে চীনে নগরচিত্র অঙ্কনের ধারাবাহিক ঐতিহ্য ছিল না। অবশ্য কিছু ব্যতিক্রমী উদাহরণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ঝ্যাং জেদুয়ানের (১০৮৫-১১৪৫) আঁকা অসাধারণ চিত্র ‘এলং দ্য রিভার ডিউরিং দ্য কুইংমিং ফেস্টিভ্যাল’। এ ছবিতে আশ্চর্যজনক সূক্ষ্মতায় ও নান্দনিকভাবে এক প্রাচীন নদীতীরবর্তী গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবন তুলে ধরা হয়েছে, যা সে সময়ের জন্য বিস্ময়কর। পরবর্তী যুগের কিছু শিল্পীও ছোট শহরের দৃশ্য এঁকেছেন, তবে প্রায় সবসময়ই সেগুলোকে প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশিয়ে। যেমন ডিং গুয়ানপেংয়ের আঁকা ‘দ্য নিউ সিটি অব ফেং’ (প্রায় ১৭৬০) শীর্ষক চিত্রকর্ম। বর্তমানে চীনা শিল্পকলায় নগরচিত্র খুব গুরুত্ব পাচ্ছে।
জাপানে নগরচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল এদো যুগ (১৬০৩-১৮৬৮)। এ সময়েই নগরকেন্দ্রিক সংস্কৃতির জন্ম হয়, যা শিল্পকলায় প্রতিফলিত হয়েছিল। শিল্পী উতাগাওয়া হিরোশিগের (আন্দো হিরোশিগে নামেও পরিচিত) ‘নাইট ভিউ অব সারোওয়াকাচো’ (১৮৫৬) এ ধরনের চিত্রের একটি সুন্দর উদাহরণ। এছাড়া উতাগাওয়া কুনিয়োশির মতো কম পরিচিত শিল্পীরাও এ সময়ে নগরচিত্র আঁকেন।
শিল্পীর ক্যানভাসে শহরচিত্র কেবল নগরের প্রতিচ্ছবি নয়, এটি সভ্যতার দলিল, সময়ের প্রতিফলন এবং মানুষের অন্তর্জগতের প্রতিচ্ছবি। প্রাচীন দেয়ালচিত্র থেকে শুরু করে ভেরমেয়ারের শান্ত আলো, ক্যানালেত্তোর দীপ্ত ভেনিস—সব ক্যানভাসেই শিল্পীরা শহরকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন। তারা নগর অভিজ্ঞতাকে রঙে, রেখায় ও আলো-ছায়ায় চিরস্থায়ী করে রেখেছেন। [পরবর্তী পর্বে সমাপ্য]
(দি আর্ট উল্ফ ডটকম-এ প্রকাশিত জি. ফার্নান্দেজের ‘পেইন্টিং দ্য সিটি: দ্য হিস্ট্রি অব সিটি স্কেপস’ শীর্ষক নিবন্ধ অবলম্বনে রচিত)