নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখতে পছন্দ করতেন সালভাদর দালি

বিংশ শতাব্দীর শিল্প ইতিহাসে সালভাদর দালি বিশেষভাবে স্থান করে নিয়েছেন।

বিংশ শতাব্দীর শিল্প ইতিহাসে সালভাদর দালি বিশেষভাবে স্থান করে নিয়েছেন। গবেষকরা তার সম্পর্কে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিলেও ত্রিশের দশকের গোড়ায় স্যুররিয়ালিজমে তার অবদানকে স্বীকার করেন প্রায় সবাই। তবে তার চিত্রকর্ম বাদ দিয়েও দালির নিজের উপস্থাপনা নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক আছে। বলা হয়ে থাকে, সালভাদর দালি তার ছড়ি, গোঁফ, দম্ভপূর্ণ পদচারণার মাধ্যমে পৌরুষ প্রকাশ করতেন। এটি তার কর্তৃত্ব প্রকাশেরও মাধ্যম। এদিকে ছবির মধ্যে তিনি দর্শকের জন্য নানা প্রশ্ন রাখেন। এ সবকিছু মিলিয়ে তিনি এক নতুন নন্দনতত্ত্বে পরিণত হন, যা তাকে শতাব্দীর দুই বা তিনজন সর্বাধিক খ্যাতিমান শিল্পীর একজন করে তুলেছে।

এ নতুন ব্যবস্থার অধীনে তার প্রথম কাজ ছিল তার শিল্প থেকে আত্মবিধ্বংসী আবেশের চিহ্নগুলো নির্বাসিত করা। এগুলো হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গুরুতর দর্শকদের মনোযোগও হারিয়ে যায়। দালি আধুনিক শিল্পের অভিজাত পরিসরে গণ্য হন ততক্ষণই, যতক্ষণ তিনি দুর্বলতার স্বীকারোক্তি দেন। সেজানের সংশয়ে একটি স্যুররিয়ালিস্ট উত্তর হয়ে ওঠেন। আত্মের এ ধরনের যন্ত্রণাগুলো যতটা আন্তরিক, ততটাই ব্যঙ্গাত্মক। ভুক্তভোগী তার ক্ষতকে এমন এক শ্রেষ্ঠত্বের চিহ্ন হিসেবে উপস্থাপন করে, যার দিকে মানবজাতির বাকি অংশ ইচ্ছা করলে এগোতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু বেদনাদায়ক উপসর্গ উল্টে দিয়ে শিল্পী সেগুলোকে অতীন্দ্রিয় শক্তির দাবি হিসেবে প্রদর্শন করেন। দুর্বলতা থেকে জন্ম নেয়া এ শক্তি আমাদের সংস্কৃতির শ্রেণীবিন্যাসে এক উচ্চ আসন নিয়ে আসে। সব ধরনের দুর্বলতা অস্বীকার করে দালি ইচ্ছেমতো নিজেকে সাজিয়ে নেন।

ত্রিশের দশকের শেষ নাগাদ দালি ‘আধুনিক শিল্পের রক্ষক’দের কাছে আপত্তিকর হয়ে ওঠেন। সম্ভবত দালি সবচেয়ে গভীরভাবে আঘাত করেছিলেন এ কারণে যে তিনি তার বাণিজ্যিকতাকে এমন ইঙ্গিতে সাজিয়েছিলেন যেখানে সেই গাম্ভীর্য প্রায়ই একটি ভান দ্বারা তৈরি হয়েছিল। এক্ষেত্রে শিল্পী কোনো বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত আত্মা নন, বরং একটি বাজারজাতযোগ্য ইমেজ। নিজের প্রতিভা সম্পর্কে তার দাবি যতই উচ্চকিত হয়েছে, প্রতি মৌসুমেই তিনি তত বেশি আগ্রহ ও দক্ষতার হলিউডের বাণিজ্যিকতায় নিজেকে ডুবিয়েছেন। তিনি নিজেকে, নিজের স্টাইলকে বাজারে তুলেছেন।

১৯৩৪ সালে তিনি স্যুররিয়ালিস্ট গোষ্ঠী থেকে বহিষ্কৃত হন। দালি একটি প্রেস হ্যান্ডআউট দিয়েছিলেন। সেখানে বর্ণনা করেছিলেন কীভাবে তিনি তার স্ত্রী গালার কাঁধে ভেড়ার চপ বসিয়েছিলেন, তাকে সূর্যাস্তের সামনে সাজিয়েছিলেন এবং তারপর মাংসের ছায়ার ধীর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে এমন ক্যানভাস এঁকেছিলেন যা নিউইয়র্কে প্রদর্শনের জন্য যথেষ্ট ‘স্বচ্ছ’ ও ‘রুচিকর’। কিন্তু সেটি টাইম ম্যাগাজিন ছাপেনি।

১৯৬২ সালে দালি বলেছিলেন, ‘আমি চিত্রকরদের মধ্যে সবচেয়ে উদার। কারণ আমি নিজেকে অবিরত ভোজ হিসেবে উৎসর্গ করি।’ মন্তব্যটি তার ‘সফট সেলফ পোর্ট্রেট উইথ ফ্রায়েড বেকন’ প্রসঙ্গে করেছিলেন। ষাটের দশকে ফের তিনি নিজেকে ‘‌মাদক’ বলে উল্লেখ করেন। এ সবকিছুই ছিল তার নিজেকে প্রাসঙ্গিক ও আলোচিত রাখার এক ধরনের চেষ্টা।

‘অ্যাটমোস্ফিয়ারিক স্কাল সডোমাইজিং আ গ্র্যান্ড পিয়ানো’ (১৯৩৪) সম্পর্কে দালি বলেন, ‘চোয়ালই মানুষের সবচেয়ে দার্শনিক যন্ত্র।’ ছবিটি প্রথম দৃষ্টিতে খুব ‘দার্শনিক’ মনে নাও হতে পারে, তবু এটি শিল্পীর শরীর-সংক্রান্ত অন্যান্য ইঙ্গিতের মতোই। তাদের সব আক্রমণাত্মক বাক ও ভয়াবহ মোচড় সত্ত্বেও প্রতিটিতেই রয়েছে এক অতীন্দ্রিয় ঝোঁক। ১৯৪৫ সালে দালি স্মরণ করেন, ‘পাঁচ বছর বয়সে আমি একটি পোকাকে পিঁপড়ে খেতে দেখেছিলাম। এরা শুধু পরিষ্কার ও স্বচ্ছ খোলস রেখে গিয়েছিল। তার শারীরিক ছিদ্র দিয়ে আকাশ দেখা যেত। প্রতিবার আমি যখন বিশুদ্ধতার কাছে যেতে চাই, আমি মাংসের ভেতর দিয়ে আকাশ দেখি।’

সাধারণ ভোগের প্রধান উপজাত, অর্থাৎ খাওয়ার ফল হলো বর্জ্য। দালিনীয় দৃষ্টি পৃথিবীকে খেতে খেতে এগোয়, তাকে গিলে ফেলে এবং তারপর বিশুদ্ধ ও পরমকে এমন চিত্রে নিষ্কাশন করে, যা নিজেরাই অনায়াসে ভোগযোগ্য।

দালির আরেকটি উল্লেখযোগ্য ছবি হলো ‘স্যাক্রামেন্ট অব দ্য লাস্ট সাপার’ (১৯৫৫ খ্রি.)। তিনি জানান, এটি এঁকেছিলেন এ সন্দেহকে প্রমাণ করতে যে জীবিত সব শিল্পীর মধ্যে তিনিই সবচেয়ে প্রিয়। চিত্রকলা গবেষক ও সমালোচকদের একটা অংশ মনে করেন, বিখ্যাত শিল্পীদের মধ্যে দালি নিজেকে তুলে ধরেছিলেন জনপ্রিয় ধারায় এবং সেজন্য তিনি নানা ধরনের গিমিক করতেন। সেগুলোই তাকে আলোচিত করেছে ও আলোচনায় রেখেছে।

আরও