মোহাম্মদ কিবরিয়ার অদেখা ভুবন

বিমূর্ততা ও রঙের টেক্সচার যেখানে শিল্পভাষা

বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে মোহাম্মদ কিবরিয়া এক অনিবার্য নাম।

বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে মোহাম্মদ কিবরিয়া এক অনিবার্য নাম। বিমূর্ত শিল্পভাষাকে যারা এ ভূখণ্ডে গভীর সাধনা, সংযম ও দার্শনিক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম পথিকৃৎ। রাজধানীর লালমাটিয়ার ডি ব্লকের ৯/৪ নম্বর বাড়ির কলাকেন্দ্রে চলছে ‘মোহাম্মদ কিবরিয়া: স্বনির্বাচিত ৮৪টি অপ্রদর্শিত মৌলিক শিল্পকর্ম ১৯৮০-২০০৬’ শীর্ষক প্রদর্শনী। এ আয়োজন শিল্পীর এক অন্তর্মুখী, ব্যক্তিগত এবং প্রায় গোপন শিল্পভুবনের দরজা খুলে দিয়েছে। শিল্পীর ৯৭তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এ প্রদর্শনী শুধু একটি শিল্প আয়োজন নয়; বরং এটি কিবরিয়ার সৃজনপ্রক্রিয়া, মানসিক ভূমি ও নীরব সাধনার এক বিরল দলিল।

মোহাম্মদ কিবরিয়াকে বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের চিত্রশিল্পী বলা হয় একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারণে। ১৯৪৮ সালে জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে যখন ঢাকায় প্রাতিষ্ঠানিক চারুকলা চর্চার সূচনা হয়, তখন প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যাচের যে শিল্পীরা পরবর্তী সময়ে শিল্পক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, তাদেরই বলা হয় প্রথম প্রজন্ম। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে জন্ম নেয়া কিবরিয়া কলকাতা আর্ট কলেজে পড়াশোনা শেষে ঢাকায় আসেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে তৎকালীন ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষকতায় যোগ দেন। আজীবন শিক্ষকতা ও শিল্পচর্চার পর শেষ জীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হন। শিক্ষক হিসেবে তার সততা, সংযম ও গভীরতা আজও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে শ্রদ্ধার বিষয়। মোহাম্মদ কিবরিয়া বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বাধীনতা পদক ও একুশে পদকসহ দেশ-বিদেশের অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন। ২০১১ সালের ৭ জুন মারা যান খ্যাতিমান এ শিল্পী।

প্রদর্শনীর ছবিগুলোর কিছু বিশেষত্ব আছে। ১৯৮০-২০০৬ সালের মধ্যে সৃষ্ট ৮৪টি মৌলিক শিল্পকর্ম এর আগে কখনো প্রদর্শিত হয়নি। শিল্পী নিজেও সম্ভবত এগুলো জনসমক্ষে দেখানোর পরিকল্পনা করেননি। অধিকাংশ কাজই ছোট আকারের, প্রায় এ-ফোর সাইজের কাগজে করা। অনেকগুলোতে কোনো স্বাক্ষর নেই। নেই কোনো টাইটেল বা নাম। এগুলো ছিল প্রায় ডায়েরির মতো শিল্পীর নিজস্ব ফাইলে সংরক্ষিত। এ কারণে শিল্পীর প্রকাশ্য সাফল্য বা প্রদর্শনীমুখী কাজের চেয়ে ভিন্ন, একেবারেই নিজের জন্য আঁকা। এ যেন শিল্পীর নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন।

প্রদর্শনীজুড়ে চোখে পড়ে কোলাজ মাধ্যমের বিস্তৃত ব্যবহার। সংবাদপত্র, প্রিন্টেড ও রঙিন কাগজ—এসব উপাদানকে কিবরিয়া সংযুক্ত করেছেন পরিমিত ও নান্দনিক আঙ্গিকে। কোথাও পেন্সিল, কলম বা রঙের সূক্ষ্ম প্রয়োগ, কোথাও আবার কেবল উপাদানের নিজস্ব টেক্সচারই হয়ে উঠেছে ভাষা। এ কোলাজগুলো কোনো উচ্চকিত বক্তব্য দেয় না; বরং তৈরি করে নীরব টানাপড়েন, ভারসাম্য ও ধ্যানমগ্ন বাস্তবতা। এখানে রঙের ব্যবহার অত্যন্ত সংযত—হালকা হলদে, বাদামি ও লালচে ভাব; আলো-ছায়ার সূক্ষ্ম কম্বিনেশন। এখানে রঙ মানেই উল্লাস নয়, বরং রঙ হয়ে ওঠে ভাবনার গভীর স্তর।

কিবরিয়ার শিল্পকর্মের এ বিমূর্ততা কোনো কাহিনী বলে না। কোনো শিরোনাম নেই, কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাও দাবি করে না। কিন্তু দর্শক যখন ছবির সামনে দাঁড়ান, তখন ছবির জমিন, স্তর, ফাঁকা জায়গা ও টেক্সচার নিজেই এক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। অনেক কাজে প্রকৃতি ও ল্যান্ডস্কেপের অনুভব জাগে, কিন্তু তা কখনই স্পষ্ট দৃশ্য হিসেবে উপস্থিত হয় না। প্রকৃতি এখানে দৃশ্যমান নয়, বরং অনুভূত। এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি, জীবনবোধ, ক্ষণস্থায়িত্ব ও নীরব বিষণ্নতা যেন বিমূর্ত রূপে উপস্থিত।

এ কাজগুলোতে লেয়ারের ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এক কাগজের ওপর আরেক কাগজ, পরতের ওপর পরত—এ নির্মাণপ্রক্রিয়া কিবরিয়ার শিল্পচিন্তার গভীরতার ইঙ্গিত দেয়। কোথাও সেমি-ট্রান্সপারেন্ট কাগজের আড়াল দিয়ে কালো জমিন উঁকি দেয়, কোথাও ভাঁজ ও ফোল্ড তৈরি করে নতুন স্ক্রিন—সবকিছু মিলিয়ে কাজগুলো দর্শককে ধ্যানমগ্ন করে তোলে।

প্রদর্শনীতে একটি হাতে বাঁধাই করা ফোলিও, পুরনো প্রদর্শনীর ক্যাটালগ, কামরুল হাসানের একটি ড্রয়িংসহ কিছু ব্যক্তিগত উপকরণও রয়েছে। এগুলো ৮৪টি ছবি ফোলিওতে যেভাবে ছিল সেভাবেই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে, যা কিবরিয়ার সৃজনপ্রক্রিয়ার পারিপার্শ্বিক দলিল। শিল্পীর পরিবার যে আস্থার সঙ্গে এ কাজগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অবদান।

এ প্রদর্শনী কোনো সরাসরি বার্তা দেয় না। বরং যারা চিত্রকলার মৌল ভাষা, উপাদান ও সংবেদনশীলতার চর্চায় আগ্রহী, তাদের জন্য এটি এক বিরল শিক্ষা ও প্রেরণার ক্ষেত্র। চারুকলার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা একে ‘রেয়ার এক্সপেরিয়েন্স’ হিসেবে দেখছেন। কারণ কিবরিয়ার এতগুলো অপ্রদর্শিত শিল্পকর্ম একসঙ্গে দেখার সুযোগ আগে কখনো আসেনি।

১ জানুয়ারি ২০২৬ সন্ধ্যায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ও আলোচক ছিলেন মোহাম্মদ কিবরিয়ার তিন ছাত্র ও খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবী, শিল্পী মনিরুল ইসলাম ও অধ্যাপক শিল্পী আবুল বার্‌ক্‌ আলভী। আলোচকরা তাদের কিংবদন্তিতুল্য শিক্ষকের স্মৃতিচারণা করেন এবং প্রদর্শনীর কাজগুলোর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন।

প্রদর্শনী ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। তবে কলাকেন্দ্রের কিউরেটর ও চিত্রশিল্পী ওয়াকিলুর রহমান জানান, দর্শক ও শিল্পপ্রেমীদের আগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করে প্রদর্শনীর সময় আরো এক সপ্তাহ বাড়ানো হবে। প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনী খোলা থাকবে।

তিনি আরো জানান, মোহাম্মদ কিবরিয়ার কাজগুলো নিয়ে একটি গ্রন্থের কাজ প্রায় শেষের দিকে। শিগগিরই এটি প্রকাশিত হবে।

‘মোহাম্মদ কিবরিয়া: স্বনির্বাচিত ৮৪টি অপ্রদর্শিত মৌলিক শিল্পকর্ম’ প্রদর্শনী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিল্প সবসময় প্রদর্শনীর জন্য তৈরি হয় না, অনেক শিল্প জন্ম নেয় নীরব সাধনায়। কিবরিয়ার এ অদেখা কাজগুলো তার সাফল্যের চেয়ে সততা, সংযম ও গভীর মানবিক বোধকে বেশি স্পষ্ট করে। এমন প্রদর্শনী কেবল অতীতের এক বিশিষ্ট শিল্পী ও তার কাজকে স্মরণ নয়; এটি সমকালীন শিল্পচর্চার জন্যও এক নীরব, কিন্তু শক্তিশালী দিকনির্দেশনা।

আরও